খাগড়াছড়ির সূর্যমুখী বাগানে টিকিটের ব্যবস্থায় বদলে গেছে দৃশ্য
খাগড়াছড়ির চেঙ্গী নদীর পাড়ে অবস্থিত সূর্যমুখী বাগান এখন দর্শনার্থীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি, এই বাগানে প্রবেশে টিকিটের ব্যবস্থা করে দুই কৃষক একটি অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন, যা আগের ক্ষতির চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
ক্ষতি থেকে আয়ের পথ
একসময় এই সূর্যমুখী বাগানে দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও আনন্দের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হতো। ফুল ছিঁড়ে নেওয়া এবং গাছ ভেঙে ফেলার মতো ঘটনাগুলো ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কৃষক আপ্রেই মারমা ও নিরুত্তম চাকমা প্রবেশে টিকিটের ব্যবস্থা করেন। তাদের এই সিদ্ধান্তই বাগানের চিত্র পাল্টে দিয়েছে।
বর্তমানে, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নানা বয়সী মানুষ টিকিট কেটে বাগানে প্রবেশ করছেন। তারা ছবি তুলছেন, সাউন্ডবক্সে গান বাজিয়ে নাচছেন এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। দর্শনার্থী রোকসানা আক্তার বলেন, ‘অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল সূর্যমুখীর বাগান দেখব, ছবি তুলব। ২০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকেছি। এত বড় বাগান কাছ থেকে দেখে খুব ভালো লাগছে।’
কৃষকদের সাফল্য
আপ্রেই মারমা চেঙ্গী নদীপাড়ের বটতলী এলাকায় প্রায় ২০ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তিনি প্রত্যেক দর্শনার্থীর কাছ থেকে ২০ টাকা প্রবেশ ফি নিচ্ছেন। এছাড়া, তিনি প্রতি ফুল ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন, যা তার আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শুরুতে অনেকেই ফুল ছিঁড়ে ও গাছ ভেঙে ক্ষতি করতেন। এক দিন রাগ করে ২০ টাকা করে প্রবেশ ফি নির্ধারণ করি। পরে দেখি, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই টিকিট কেটে ফুলবাগানে প্রবেশ করছেন।’
অন্যদিকে, নিরুত্তম চাকমা খবংপুড়িয়া এলাকায় ৪০ শতক জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তিনি জনপ্রতি ৫০ টাকা নিচ্ছেন এবং গত বছর টিকিট বিক্রি করে ১০ হাজার টাকা আয় করেছিলেন। তিনি এ বছর আরও বেশি আয়ের আশা করছেন। খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী অনুপ্রভা চাকমা বলেন, ‘কলেজের পাশেই সূর্যমুখীবাগান। তাই সুযোগ পেলেই ঘুরে আসি। টাকা নিলেও ছবি তোলে আর আড্ডা দিয়ে মন ভরে।’
কৃষি বিভাগের ভূমিকা
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ৪০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, এবং এ বছর ৩৭ হেক্টর জমিতে দেওয়া হচ্ছে। জেলায় অনেকে সূর্যমুখী চাষ করলেও পাহাড় ও নদীর পাড়ে বড় পরিসরে চাষের কারণে নিরুত্তম ও আপ্রেই মারমার বাগানে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা মুক্তা চাকমা বলেন, ‘খাগড়াছড়ির মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য উপযোগী। এটি একটি তেল-জাতীয় ফসল। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ফুল চাষে তেলের চাহিদা পূরণ পাশাপাশি সয়াবিন তেলের আমদানি কমানো সম্ভব হবে।’
এই উদ্যোগটি শুধু কৃষকদের আয় বৃদ্ধিই নয়, বরং পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। আগামী বছর আপ্রেই মারমা এক একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করার পরিকল্পনা করেছেন, যা আরও বেশি দর্শনার্থী আকর্ষণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
