নাটোরের বড়াইগ্রামে সজনের বাম্পার ফলন, এক কোটি টাকার 'সুপার ফুড' উৎপাদনের সম্ভাবনা
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার রাস্তার ধার, বসতবাড়ির আঙ্গিনা ও মাঠঘাটে হাজার হাজার সজনে গাছ শ্বেত-শুভ্র ফুলে ভরে গেছে। এ বছর এই উপজেলায় সুস্বাদু সবজি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন 'সুপার ফুড' হিসেবে খ্যাত সজনের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে কমপক্ষে দুশ মেট্রিক টন সজনে উৎপাদিত হতে পারে, যার বাজার মূল্য সর্বনিম্ন এক কোটি টাকা ধরা হচ্ছে।
সজনের ব্যাপক চাষ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
বড়াইগ্রাম উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় ২ থেকে ৪টি সজনে গাছ রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশেও অসংখ্য সজনে গাছ বেড়ে উঠেছে। ইদানীং অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে সজনের চাষ শুরু করেছেন। সজনের উৎপাদন খরচ একেবারেই কম, কারণ কোনো প্রকার বালাইনাশক প্রয়োগ বা বিশেষ পরিচর্যা ছাড়াই এটি চাষ করা যায়। বাড়ির পাশে বা জমিতে ডাল পুঁতে রাখলেই ধীরে ধীরে শিকড় গজিয়ে উপযুক্ত গাছে পরিণত হয় এবং সজনে ধরে।
বাড়িতে তরকারীর চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উৎপাদনকারীরা এসব সজনে বাজারে বিক্রি করে বাড়তি উপার্জন করেন। মৌসুমজুড়ে সজনে ৫০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করা হয়। উপজেলার লক্ষীকোল, মৌখাড়া, বনপাড়া, জোনাইল, রাজাপুর ও আহম্মেদপুর হাট থেকে ব্যাপারীরা সজনে সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করেন।
তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ও লাভজনক চাষ
তরুণ উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান ময়না জানান, তিনি দুই বিঘা জমি লিজ নিয়ে সজনের চাষ করেছেন। সজনে বিক্রির পাশাপাশি সজনের পাতা থেকে ভেষজ ওষুধ তৈরিই তার মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, সজনে গাছের বয়স ১০ থেকে ১২ মাস হলেই তাতে সজনে ধরতে শুরু করে। একটি পরিণত গাছে ৮ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত সজনে ধরে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এই ফসলের চাষ বেশ লাভজনক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সজনের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. জাহেদুল ইসলাম বলেন, সজিনা পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি সবজি। ভিটামিন এ এর অভাব দূরীকরণে এটি অত্যন্ত উপযোগী। এটি প্যারালাইসিস রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। সজিনায় ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিংক ও ভিটামিন সি রয়েছে, যা মানবদেহের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্যও এটি অনেক উপকারী। এছাড়া সজিনার পাতা শাক হিসেবে খাওয়া যায়।
পরিবেশবান্ধব 'মিরাকল ট্রি' হিসেবে সজনের স্বীকৃতি
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব আল মারুফ জানান, পরিবেশবান্ধব ও অর্থকরী আঁশজাতীয় সবজি সজিনাকে 'মিরাকল ট্রি' বলা হয়। এই গাছের পাতা, ফুল, ফল সবই খাওয়া যায়। সজিনা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি বাড়ির পাশের অনাবাদী ও পতিত জমিতে চাষ করা যায়। ঠাণ্ডা-গরম ও খরা সহিষ্ণু হওয়ায় এই গাছ বাংলাদেশের সর্বত্রই জন্মাতে পারে। সজিনা গাছের তেমন কোনো রোগবালাই নেই বললেই চলে।
তিনি আরও জানান, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এবার উপজেলায় কমপক্ষে ২০০ মেট্রিক টন সজনে উৎপাদিত হবে, যা বাজার দরে সর্বনিম্ন এক কোটি টাকা মূল্যের হতে পারে। এই বাম্পার উৎপাদন স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
