রাজশাহীর-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আবু সাঈদ চাঁদের দাপটে বিএনপি নেতা রবিউল ইসলাম রবিন পুকুর খনন করছেন। আর এ কাজে সহযোগিতা করছেন এমপির ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) জালাল উদ্দিন।
রাতের আঁধারে জমি নষ্ট
চারঘাট উপজেলার ইউসুফ ইউনিয়নের মিরকামাড়ি এলাকায় রাতের আঁধারে গত এক মাস ধরে তিন ফসলি জমিতে বাধাহীনভাবে চলছে এ পুকুর খনন। স্থানীয় প্রশাসন এলাকাবাসীর দাবির মুখে দুই দফা অভিযান চালিয়েও বন্ধ করতে পারেনি খনন কার্যক্রম। এমপির ক্ষমতায় পিএ জালালের দাপটে খনন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
কৃষকদের উদ্বেগ
এলাকার কৃষকরা বলছেন, পুকুর খননের ফলে তিন ফসলি জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। জমি পানিতে তলিয়ে পতিত হয়ে যাবে। ফসল ফলবে না। পুকুরের খনন করা মাটি বাইরে বিক্রি করা হচ্ছে। ভারি যানবাহনে মাটি পরিবহণের ফলে সড়ক নষ্ট হচ্ছে।
রবিউল ইসলাম রবিন ইউসুফপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি এবং ইউনিয়নটির সাবেক চেয়ারম্যান। এমপি চাঁদ তার আপন ভাইরা ভাই। নির্বিঘ্নে পুকুর খনন চললেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা রবিনের দাপটে রয়েছেন নিশ্চুপ।
খনন কার্যক্রমের বিবরণ
এলাকাবাসী বলছেন, গত এক মাস আগে আট বিঘা জমিতে পুকুর খনন কার্যক্রম শুরু করেন বিএনপি নেতা রবিন। রবিনের পাশাপাশি খনন কার্যক্রম চলতে থাকা পুকুরটিতে স্থানীয় সুমন, রবিউল, ইলিয়াস, আকতার এবং ইন্তাজ নামের ব্যক্তিদের জমি রয়েছে। রবিন অন্যদের জমি বছর চুক্তিতে লিজ নিয়ে খনন শুরু করেছেন। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হচ্ছে খনন কার্যক্রম।
সরেজমিন দেখা গেছে, চারদিকে সবুজ ধানের মাঠের মাঝখানে প্রায় আট বিঘা জমিজুড়ে খননকাজ চলছে। পুকুরের উত্তর-পশ্চিম কোণে ইতোমধ্যে খনন শেষ হয়েছে। খননস্থলের পাশেই রয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ। এ নলকূপ থেকে এলাকার কৃষকরা সেচ সুবিধা নেন। জমির মাঝে পুকুরটি খনন করায় ফসল চাষে ক্ষতির সম্মুখীন হবেন বলে তারা জানিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের বক্তব্য
মিড়কামারি এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'ক্ষমতার দাপটে তিন ফসলি জমি নষ্ট করে পুকুর খনন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদের জমি থাকবে না। আমরা না খেয়ে মরব। আমাদের কথা শোনার কেউ নেই। স্থানীয় প্রশাসনও অসহায়। তারা অদৃশ্য এক কারণে পুকুর খনন বন্ধ করতে পারছে না।'
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আসকান বলেন, 'পুকুর খনন না করার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা আছে; কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই এক্সকেভেটর, ট্রাক্টর আর ট্রাকের শব্দে ঘুমাতে পারি না। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। আর সরকার কোটি টাকা খরচ করে সড়ক বানিয়েছে, ভারি যানবাহনে মাটি পরিবহণের কারণে সেটি নষ্ট হচ্ছে।'
প্রশাসনের ব্যর্থতা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ এপ্রিল চারঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাতুল করিম মিজান অভিযান চালান। তিনি বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বেও রয়েছেন। তার নির্দেশে ব্যাটারি ভেঙে ফেলে এক্সকেভেটর অকেজো করে ফেলা হয়। এরপর সেদিন সন্ধ্যা থেকেই বিএনপি নেতা রবিন আবারও খনন কার্যক্রম শুরু করেন।
গত ৫ মে স্থানীয় মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে আবারও অভিযান চালান সহকারী কমিশনার। ঘটনাস্থলে থাকা অবস্থায় এমপি আবু সাঈদ চাঁদের পিএ জালাল উদ্দিন সহকারী কমিশনারকে অভিযান না চালানোর জন্য সুপারিশ করেন। জালাল সহকারী কমিশনারকে আশ্বস্ত করেন, খনন কার্যক্রম আর চালানো হবে না। এরপর সহকারী কমিশনার ঘটনাস্থল থেকে ফিরে যান; কিন্তু জালাল আশ্বস্ত করলেও আবারও শুরু হয় খনন কার্যক্রম।
পিএ জালালের অস্বীকৃতি
অভিযোগ অস্বীকার করে জালাল উদ্দিন বলেন, 'বিএনপি নেতা রবিন পুকুর খনন করছে বলে আমার জানা নেই। রবিন ও এমপি পরস্পরের ভাইরা ভাই সম্পর্কের বিষয়টিও আমার অজানা। তবে তাদের মধ্যে ভাইয়ের সম্পর্ক আছে বলে জানি। আমি পুকুর খনন কার্যক্রম অভিযান চলার সময় সহকারী কমিশনারকে ফোন দিইনি।'
প্রতিবেদক জানালে তিনি বলেন, 'সহকারী কমিশনার কিভাবে আমার ফোন দেওয়ার বিষয়টি বললেন, সেটি আমি বলতে পারব না।'
সহকারী কমিশনারের বক্তব্য
এমপি আবু সাঈদ চাঁদের পিএ জালাল ফোন দিয়েছেন বলে স্বীকার করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাতুল করিম মিজান বলেন, 'আমি এ ঘটনায় দুইবার অভিযান চালিয়েছি। প্রথমবার এক্সকেভেটর অকেজো করে খনন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার শুরু করলে আমি আবারও অভিযান চালাই। ঘটনাস্থলে থাকার সময়ে এমপি স্যারের পিএ জালাল সাহেব আমাকে ফোন দেন। তিনি আশ্বস্ত করেন, আর খনন করা হবে না। তারপরেও আবার যদি খনন শুরু করা হয়, তাহলে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
এমপি চাঁদের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাতবার বিএনপি নেতা রবিনকে ফোন দেওয়া হয়। তিনি ধরেননি। এ কারণে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে দলীয় ক্ষমতার দাপট এবং নিকটাত্মীয় হওয়ার কারণে সাবেক চেয়ারম্যান রবিন পুকুর খনন করছেন- রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি কিছুটা ক্ষুব্ধ হন। তিনি বলেন, 'কে ভাইরা, কে আপন কিংবা কে পর- আমি জানি না। সেটা বড় কথা না। এটা আপনার জানার দরকার নেই। শুধু চারঘাট নয়, সারা রাজশাহীতে পুকুর কাটা হচ্ছে। এ বিষয়টি দেখবে প্রশাসন।'



