সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল আবারও প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম আঘাতে বিপর্যস্ত। যে সময়ে বোরো ধানের মৌসুম কৃষকের ঘরে স্বস্তি ও প্রাচুর্যের বার্তা নিয়ে আসার কথা, ঠিক সেই সময়ে অকালবন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় মাঠভরা সোনালি ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কৃষকের বেদনা ও সামষ্টিক ব্যর্থতা
দিনরাত পরিশ্রমে ফলানো ফসল চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখে কৃষকের বুকফাটা কান্না কেবল ব্যক্তিগত বেদনা নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও কেন আমরা টেকসই সমাধান গড়ে তুলতে পারছি না?
হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জ
হাওরাঞ্চল একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও জলবৈচিত্র্যময় অঞ্চল, যেখানে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পানি থাকে এবং শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ হয়। এ অঞ্চলের কৃষি সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতিনির্ভর আর এটাই এর শক্তি, আবার একই সঙ্গে বড় দুর্বলতাও। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উজানের ঢল, অকালবৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এতটাই তীব্র হয়েছে যে কৃষকেরা আর আগের মতো নিশ্চিন্তে ফসল তুলতে পারছেন না।
এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বোরো ধান কাটার আগেই আকস্মিক পানির স্রোত ঢুকে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে। ফলে ধান পানিতে পচে যাচ্ছে এবং কৃষকের বছরের একমাত্র আয়ের উৎস মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ বিপর্যয় কি কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ফল, নাকি এতে আমাদের পরিকল্পনার ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
প্রয়োজন স্বতন্ত্র কৃষিনীতি ও প্রযুক্তি
হাওরাঞ্চলের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও প্রেক্ষিতভিত্তিক কৃষিনীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এ অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা বিবেচনায় এমন ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করতে হবে, যা স্বল্প সময়ে ফলন দেয় এবং বন্যার আগেই ঘরে তোলা সম্ভব হয়। পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা এবং একটি কার্যকর আগাম সতর্কবার্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে তাঁরা সম্ভাব্য দুর্যোগ সম্পর্কে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন।
খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব
এ পরিস্থিতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বাস্তবতা হলো এটি পুরো দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও সরাসরি আঘাত। বোরো ধান বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। ফলে এ ফসলের ক্ষতি মানে কেবল মাঠের ক্ষতি নয়, বাজারব্যবস্থার অস্থিরতা, চালের দামের ঊর্ধ্বগতি ও সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের ঝুঁকি। এর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর, যাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ব্যয়ে চলে যায়।
এ সংকট ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি কেবল কৃষকের ক্ষতিপূরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্র কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে একটি খাদ্যসংকট প্রতিরোধে সক্ষম, সেটিই মূল পরীক্ষা।
জরুরি পদক্ষেপ: দুর্যোগপূর্ণ এলাকা ঘোষণা ও সহায়তা
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চলকে দ্রুত ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা। এ ঘোষণার মাধ্যমে সরকারিভাবে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমে আসবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিনা মূল্যে খাদ্যসহায়তা, কৃষিঋণ মওকুফ বা পুনঃ তফসিল এবং আবার চাষাবাদের জন্য উন্নতমানের বীজ ও সার সরবরাহ—এসব পদক্ষেপ বিলম্ব না করে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নগদ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা অন্তত ন্যূনতম জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারে এবং ঋণের ফাঁদে আরও গভীরভাবে বিপর্যস্ত না হয়ে পড়ে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পানি ব্যবস্থাপনা
উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং অপরিহার্য। হাওরাঞ্চলের পানি সমস্যা কেবল স্থানীয় বাস্তবতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি আন্তসীমান্ত ইস্যু, যার সমাধান এককভাবে সম্ভব নয়। তাই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিনিময় এবং পূর্বাভাসব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা না থাকলে কোনো প্রকল্পই দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর হবে না। বাস্তবতা হলো পরিকল্পনার ঘাটতির চেয়ে বাস্তবায়নের দুর্বলতাই আমাদের বড় সংকট।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দমন
কৃষিকে শুধু উৎপাদনের প্রশ্ন হিসেবে না দেখে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা—এটাই এখন সময়ের দাবি। তবে এসব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চক্র ভাঙা না যায়। বাস্তবতা হলো, হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ প্রায়ই যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় না। ফলে দুর্বল ও নিম্নমানের বাঁধ সহজেই ভেঙে পড়ে আর তার খেসারত দিতে হয় কৃষকদের—ডুবে যায় বছরের একমাত্র ফসল। এই পুনরাবৃত্তি ব্যর্থতা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতির স্পষ্ট প্রমাণ। তাই কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা ও দায় নির্ধারণ ছাড়া এই চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত পথ নেই।
সম্মিলিত ভবিষ্যৎ রক্ষায় করণীয়
সবশেষে বলতে হয়, হাওরের কৃষকেরা কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নন, তাঁরা আমাদের দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। সুতরাং আমাদের বুঝতে হবে, তাঁদের এ দুর্দশা উপেক্ষা করা মানে কেবল একটি অঞ্চলকে অবহেলা করাই নয়; বরং আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
তাই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা সাময়িক সহানুভূতি দিয়ে দায় এড়ানোর সময় এখন আর নেই; প্রয়োজন বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ। আজ আমরা যদি দ্রুত ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী বছরগুলোয় এ সংকট আরও গভীর ও বিস্তৃত আকার ধারণ করবে। হাওরের বুকভরা পানি তখন শুধু ফসল নয়, আমাদের পরিকল্পনাহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার ইতিহাসও ডুবিয়ে দেবে।
তাই এখনই সময় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলকে ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ ঘোষণা, জরুরি সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা এবং একটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ‘মেগা প্রকল্প’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওরবাসীর পাশে দাঁড়ানোর। এতে শুধু কৃষকই রক্ষা পাবে না; বরং সংরক্ষিত হবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।



