কড়া রোদে সিলেট অঞ্চলের কৃষকেরা শনিবারেও কিছু ভেজা ধান ও পচা খড় শুকাতে পেরেছেন, কিন্তু দৃশ্যটি মনোহর হলেও এখনো বহু কৃষক চরম দুর্দশায় রয়েছেন। বহু কৃষকের স্তূপ করা ধান পচে খড়ের সঙ্গে মিশে জমাট বেধে গেছে, যা ভাঙিয়ে আর চাল করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে পানি কিছুটা শুকালে এবং রোদ উঠলেও গভীর হাওর থেকে ধান কেটে ঘরে আনা যাচ্ছে না।
গোপাটের বেহাল দশা
হাওরের ভিতরে মাটির রাস্তা, যা গোপাট নামে পরিচিত, তার অবস্থা বড়ই বেহাল। কাদা মাটিতে ট্রাক্টর চলছে না, এমনকি মাথায় করেও কৃষক ধানের গোচি আনতে পারছেন না। কোনো কোনো স্থানে নৌকাও চলছে না। তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরের এমন চিত্র জাতীয় সংসদে তুলে ধরে প্রতিকার চেয়েছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেছেন, এখন পর্যন্ত ৯৮ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং তা এখনো চলছে। এবার কৃষকদের দুর্গতির শেষ নেই। একটার পর একটা দুর্গতি যেন লেগেই আছে। শাল্লা, দিরাই, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় কৃষকদের নানা দুর্গতি দেখা যায়।
জলাবদ্ধতায় কৃষকের আহাজারি
এসব এলাকায় জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আহাজারি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। তারা এখন ঋণের চাপে জর্জরিত। খেত করেছিলেন ঋণ করে, এখন ঋণদাতারা হাজির। কিন্তু কোথা থেকে ঋণ দেবেন? সেখানে খেয়ে পড়ে বাঁচাই দায়।
ইনচান আলীর কাহিনী
দেখার হাওরের রৌয়ার পাড় এলাকার হাছনপছন্দ গ্রামের ইনচান আলী এবার প্রায় আট একর জমি করেছিলেন শিয়ালমারা হাওরে। এক কাঠা জমিও কাটতে পারেননি, সব পানির নিচে ডুবে গেছে। ইসলামপুরের আলামিন মিয়ার কাছ থেকে ৫০ হাজার, গুয়ারছুড়ার সাহিদ আলীসহ আরও অনেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা ঋণ করে বোরো চাষবাস করেছিলেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা খরচ এবং জমি-জমা চাষবাসের খরচ মেটাতে এত ঋণ হয়েছে। ধান পেলে ছয়-সাতশ মণ ধান পেতাম, ঋণ মেটাতে সমস্যা হতো না। কিন্তু ধান না পাওয়ায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। তিনি আরও জানান, শিয়ালামারা হাওরে কোনো কৃষকই ধান কেটে আনতে পারেননি।
কথা বলার এক পর্যায়ে অশ্রুসজল ইনচান আলী বলেন, ‘আজও এক পাওনাদার এসে রাগ দেখিয়ে গেছে। তাকে ১ লাখ টাকায় ২৫ মণ লাভের ধান ও নগদ ১ লাখ ফেরত দেবার কথা ছিল। এখন যন্ত্রণা সহ্য হয় না। পাঁচ ছেলে ও মেয়ে নিয়ে মনে হয় কোথাও চলে যাই। কিন্তু তাদের লেখাপড়ার কী হবে?’ এমন মর্মস্পর্শী দৃশ্য নিচু এলাকার অনেক কৃষকের।
সাহেব আলীর অবস্থা
গুয়ারছড়া গ্রামের সাহেব আলী কৃষক জানান, সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ করে জমি করেছেন। অর্ধেক জমিও কাটা হয়নি। সাহেব আলী গতকাল খলায় হঠাৎ জ্ঞান হারান, পরে তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি জানান, এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া গতি নেই।
বর্গাচাষিদের বিপদ
কৃষকরা জানান, গুয়ারছুড়া, রৌয়ারপাড় ও হাছনপছন্দ এলাকায় অন্তত ২০ জন বর্গাচাষি ঋণ করে চাষবাস করে এমন বিপদে পড়েছেন। গোখাদ্যের অভাবে অনেকেই কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।



