ইইউ কৃষি ভর্তুকির বিপুল অর্থ যাচ্ছে আমিরাতের রাজপরিবারের হাতে
ইইউ কৃষি ভর্তুকির অর্থ যাচ্ছে আমিরাতের রাজপরিবারে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কৃষি ভর্তুকির বিপুল অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ক্ষমতাসীন রাজপরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে বলে এক যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান' ও 'ডিসমগ'–এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউরোপের কৃষিখাতের জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি ইউরোর ভর্তুকি শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই ধনী রাজপরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থকে শক্তিশালী করছে।

ভর্তুকির পরিমাণ ও প্রাপক

গতবৃহস্পতিবার (৭ মে) দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় বছরে রোমানিয়া, ইতালি ও স্পেনে থাকা খামারগুলোর জন্য আল-নাহিয়ান পরিবার ৭ কোটি ১০ লাখ ইউরোর বেশি কৃষি ভর্তুকি পেয়েছে। এই পরিবারটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাজপরিবার হিসেবে পরিচিত। তাদের সম্পদের বড় অংশই এসেছে তেল ব্যবসা থেকে।

ক্যাপ কর্মসূচি ও ভর্তুকির অপব্যবহার

ইইউর সাধারণ কৃষিনীতি বা 'ক্যাপ' কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি ইউরো ভর্তুকি দেওয়া হয়। এই অর্থ মূলত কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সহায়তার জন্য বরাদ্দ হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও রাষ্ট্র-সমর্থিত বড় করপোরেট গোষ্ঠীর কাছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভর্তুকিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্তত ১১০টি ভর্তুকি গেছে আমিরাতের রাজপরিবার ও তাদের নিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ সংস্থা 'এডিকিউ'-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কাছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সবচেয়ে বড় ভর্তুকিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান

সবচেয়ে বড় অঙ্কের ভর্তুকি পেয়েছে রোমানিয়ার কৃষি প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রিকোস্ট। প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর আয়তনের এই খামারটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় একক খামার হিসেবে পরিচিত। শুধু ২০২৪ সালেই প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৫ লাখ ইউরো ভর্তুকি পেয়েছে, যা ইউরোপের সাধারণ খামারের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ গুণ বেশি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উৎপাদিত ফসলের রপ্তানি

অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, আমিরাতের মালিকানাধীন এসব খামারে মূলত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত আলফালফাসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত ফসলের বড় অংশই পরে মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা হয়। বিশেষ করে আমিরাতের দুগ্ধশিল্পে এসব পশুখাদ্যের চাহিদা রয়েছে।

উদ্বেগ ও সমালোচনা

অধিকারকর্মীরা বলছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আমিরাতের শাসকগোষ্ঠী ইউরোপীয় ভর্তুকির সুবিধা পাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। যদিও এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে ইউএই। ইউরোপীয় এনভায়রনমেন্ট ব্যুরোর পরিচালক ফস্টিন বাস-ডিফোসেজ বলেন, বর্তমান ভর্তুকি কাঠামো প্রকৃত কৃষকদের বদলে বড় ভূস্বামী ও ধনী গোষ্ঠীর সম্পদ বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, এই অর্থ এখন এমন শাসনব্যবস্থার হাতেও যাচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের গ্রিন পার্টির সদস্য থমাস ওয়েইৎস এই ঘটনাকে 'প্রকাশ্য কেলেঙ্কারি' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইউরোপের অধিকাংশ প্রকৃত কৃষক যেখানে খুব সামান্য ভর্তুকি পান, সেখানে বিপুল অঙ্কের অর্থ ধনী তেলনির্ভর রাজপরিবারের কাছে চলে যাচ্ছে।

আমিরাতের খাদ্যনিরাপত্তা কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে কৃষিজমি ও কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে আমিরাত। দেশটিতে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানিসংকটের কারণে স্থানীয়ভাবে কৃষি উৎপাদন সীমিত হওয়ায় তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ খাদ্য আমদানিনির্ভর। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান