লোডশেডিংয়ে হিট স্ট্রোকে মুরগির মৃত্যু, দিশাহারা কক্সবাজারের খামারিরা
লোডশেডিংয়ে হিট স্ট্রোকে মুরগির মৃত্যু, দিশাহারা খামারিরা

কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি পোলট্রি খামারে খাবার দিচ্ছেন একজন খামারি। বৈদ্যুতিক ফ্যান থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে বেশির ভাগ সময় তা চালানো যায় না। এতে প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে খামারের মুরগি। সম্প্রতি তোলা ছবি: প্রথম আলো

‘বৈদ্যুতিক আলো ও ফ্যানের বাতাসের ওপর মুরগির খামার নির্ভরশীল। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে হিট স্ট্রোকে মুরগি মারা যাচ্ছে। জেনারেটর না থাকায় কোনো বিকল্পও নেই। এভাবে চলতে থাকলে শত শত খামারি পথে বসবে।’ কথাগুলো বলছিলেন জাফর আলম। কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের বাংলাবাজার জুমছড়ি এলাকায় চার বছর ধরে পোলট্রি খামার পরিচালনা করছেন তিনি। সম্প্রতি প্রচণ্ড গরমে তাঁর খামারের প্রায় ৩০০টি মুরগি মারা গেছে। অবশিষ্ট ১ হাজার ১০০টি মুরগি নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। একই অবস্থা উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নেও। ওই ইউনিয়নের তেতৈয়া গ্রামের আরেকটি খামারে সম্প্রতি মারা গেছে ২১৯টি মুরগি। সেখানে এখন রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি মুরগি। খামারের কর্মচারী আমজাদ হোসেন বলেন, দিনে চার থেকে পাঁচ দফায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। পর্যাপ্ত আলো, বাতাস ও পানি না পেয়ে মুরগি মারা যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং

জেলা শহরে দৈনিক ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি হচ্ছে বলে জানান কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণি। তিনি বলেন, কক্সবাজার শহরে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ৮২ মেগাওয়াটের মতো। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এ কারণে দৈনিক ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকে। ঘাটতি পুষিয়ে নিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জ্বালানিসংকটের কারণে গত এক মাস জেনারেটর ঠিকমতো চালানো যায়নি। সময়মতো পানি সরবরাহ সম্ভব না হওয়ায় শত শত মুরগি মারা গেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে খাদ্যের দামও।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খামারগুলোর অবস্থা

কক্সবাজার জেলায় অন্তত ৩০ হাজার মুরগির খামার রয়েছে বলে ব্রয়লার সমিতির দাবি। এর মধ্যে ৩ হাজার খামার আছে কক্সবাজার সদর উপজেলায়। এসব খামারের সব কটিতেই বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্যান চালানো যাচ্ছে না বলে খামারমালিকেরা দাবি করেছেন। এ কারণে প্রচণ্ড গরম থেকে মুরগিগুলোকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। গত রবি ও সোমবার শহরের সমিতিপাড়া, কলাতলী, আদর্শগ্রাম, লারপাড়া, লিংকরোড ও বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি খামার ঘুরে হিট স্ট্রোকে মুরগি মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় ও পোলট্রি মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলায় ৩০ হাজারের বেশি পোলট্রি খামার রয়েছে। এর মধ্যে লেয়ার খামার (ডিম উৎপাদন খামারের মুরগি) ১৫ হাজার, ব্রয়লার ৯ হাজার এবং সোনালি মুরগির খামার ৬ হাজারের বেশি।

গত বছর জেলার এসব খামারে প্রায় ৩৫ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছিল। জেলার বছরে ডিমের চাহিদা রয়েছে ২১ কোটি। একই সময়ে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদিত হয়েছে। জেলার জনসংখ্যা ২৮ লাখ। এর বাইরে রয়েছে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী। বর্তমানে খামার পর্যায়ে বাচ্চা মুরগি ৩০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৫৫ টাকা ও সোনালি মুরগি ২৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে এসব মুরগি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ডিম বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকায়।

খামারি সমিতির উদ্বেগ

কক্সবাজার ব্রয়লার মালিক সমিতির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল সায়মুন বলেন, জেলার ৯০ শতাংশ খামার বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ঘন ঘন লোডশেডিং ও প্রচণ্ড গরমে অনেক খামারে প্রতিদিন ৩০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত মুরগি মারা যাচ্ছে। আগে লোডশেডিংয়ের সময় প্রায় ৪০ শতাংশ খামারে জেনারেটর চালানো হতো। কিন্তু ডিজেলের সংকটে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। মুরগির রোগব্যাধি ও ডিমের দাম কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে দুই হাজারের বেশি খামার বন্ধ হয়ে গেছে।

বাড়ছে উৎপাদন খরচ, দিশাহারা খামারিরা

কক্সবাজার শহরতলীর লিংকরোড এলাকার চেইন্দায় ছয় বছর ধরে পোলট্রি খামার করছেন রাশেদুল করিম। তিনি কক্সবাজার শহর পোলট্রি ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি। দেড় মাস আগে খামারে ছয় হাজার মুরগি তোলেন তিনি। অতিরিক্ত গরমে ইতিমধ্যে দেড় হাজার মুরগি মারা গেছে বলে দাবি করেন রাশেদুল করিম। তিনি বলেন, ৩৪ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যেও ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। বর্তমানে খামারে ৪ হাজার ৭০০টি মুরগি রয়েছে, প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি মারা যাচ্ছে। কলাতলী এলাকার কয়েকজন খামারমালিক বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে গত এক মাস জেনারেটর ঠিকমতো চালানো যায়নি। সময়মতো পানি সরবরাহ সম্ভব না হওয়ায় শত শত মুরগি মারা গেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে খাদ্যের দামও। আগে এক বস্তা খাদ্যের দাম ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা, এখন তা বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকায় পৌঁছেছে।

উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়তি দামে বিক্রি করতে পারছেন না বলে দাবি খামারমালিকদের। তাঁদের দাবি, আগে একটি ডিম ১০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ পড়ছে সাড়ে ৯ থেকে ১১ টাকা। জ্বালানি, শ্রমিকের বেতন, ওষুধ, পরিবহন ও যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ খামারি লোকসানে পড়েছেন।

রামু ও কুতুবদিয়ায়ও একই অবস্থা

রামুতেও বেশ কয়েকটি খামারে হিট স্ট্রোকে মুরগি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলায় বর্তমানে ৩০৩টি পোলট্রি খামার রয়েছে। এর মধ্যে লেয়ার ১৫৩টি, ব্রয়লার ১২০টি ও সোনালি ৩০টি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চিকিৎসক অসীম বরণ সেন বলেন, অতিরিক্ত গরম ও পানির সংকটে মুরগি মারা যাচ্ছে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ডিমের দাম কমে যাওয়ায় খামারিরা লোকসানে রয়েছেন। ইতিমধ্যে রামুতে প্রায় ৭০টি খামার উৎপাদন বন্ধ করেছে। সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়ার কয়েকটি খামারেও মুরগি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলায় ৯৭টি খামারের মধ্যে ৩২টি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে সেখানে টিকে আছে ৫২টি ব্রয়লার, ১টি লেয়ার ও ১টি সোনালি খামার। মহেশখালীতেও অন্তত ১২টি খামারে মুরগি মারা গেছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এ এম খালেকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অধিকাংশ খামারে আধুনিক ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা নেই। অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোকে মুরগি মারা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ডিম উৎপাদনও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে গেছে। আমরা খামারিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তাঁদের পরিবেশবান্ধব খামার গড়ার পরামর্শ দিচ্ছি।’