হবিগঞ্জে টানা ভারী বৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলের কৃষিতে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, আর খলায় ও সড়কের পাশে রাখা ধান ভিজে পচে নষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলেও কঠোর শর্তের কারণে অনেক কৃষক ভেজা ধান বিক্রি করতে পারছেন না।
হাওর এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি
জেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রবিবার মধ্যরাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত টানা বর্ষণে বিস্তীর্ণ জমির পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে। অনেক কৃষক কাটা ধান খলায় তুলে রাখলেও অব্যাহত বৃষ্টিতে তা শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান কাটতেও পারছেন না অনেকেই। ফলে মাঠে থাকা এবং কাটা— দুই ধরনের ধানই ঝুঁকিতে পড়েছে।
ক্ষতির পরিমাণ ও অগ্রগতি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার ৫৩৭ হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১৯ হাজার ৬৩০ জন কৃষক। ধান কাটার অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়— এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে, বাকি রয়েছে ৬৭ শতাংশ।
সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম
এদিকে, হবিগঞ্জসহ দেশের ৬টি জেলায় সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে হবিগঞ্জ থেকে ৮ হাজার ৯০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা দরে কেনা হচ্ছে এবং একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৩০০ কেজি ধান বিক্রি করতে পারবেন। এ কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে ধানের আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতার কারণে ভেজা ধান বিক্রি করতে পারছেন না অধিকাংশ কৃষক।
কৃষকদের প্রতিক্রিয়া
বানিয়াচং উপজেলার কৃষক আব্দুল মালিক বলেন, ক্ষেতের ধান পানির নিচে, আর যেগুলো কেটেছি সেগুলো শুকাতে পারছি না। বৃষ্টির কারণে সব ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন যদি সরকার না নেয়, তাহলে আমরা কোথায় যাবো?
গুঙ্গিয়াজুড়ি হাওরের কৃষক রফিক মিয়া বলেন, ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাচ্ছি না। যেগুলো কেটেছি সেগুলোও ভিজে গেছে। আর্দ্রতা বেশি থাকায় সরকারি গুদামে দিতে পারছি না। এতে আমাদের বড় ক্ষতি হচ্ছে।
বেরি হাওরের কৃষক জহির উদ্দিন বলেন, ঋণ করে চাষ করেছি। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের শর্ত শিথিল করা এবং দ্রুত বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে উৎপাদন খরচ তোলাই অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।
খাদ্য বিভাগের অবস্থান
হবিগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জ্যোতি বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, সরকারি নির্দেশনা মেনে নির্ধারিত আর্দ্রতার মাত্রা যাচাই করেই ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভেজা ধান দীর্ঘদিন গুদামে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়, তাই নীতিমালার বাইরে গিয়ে ভেজা ধান কেনা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কথা বিবেচনায় রেখে মিল মালিকদের ভেজা ধান কেনার জন্য উৎসাহিত করছে খাদ্য বিভাগ। পাশাপাশি, কোনও কৃষক ভেজা ধান নিয়ে খাদ্য গুদামে এলে গুদামের ভেতরেই তা শুকানোর সুযোগ দেওয়া হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে।



