হাওরে ত্রিমুখী সংকট: কাচইরা বছরে তলিয়ে যাচ্ছে ফসল, প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
হাওরে ত্রিমুখী সংকট: কাচইরা বছরে তলিয়ে যাচ্ছে ফসল

মাড়াইয়ের পর ধান রাখা হয়েছিল স্তূপ করে। চার দিন বৃষ্টির কারণে শুকানো যায়নি। বাতাসে উড়িয়ে ধান থেকে চিটা ছাড়ানোর চেষ্টা এক কিষানির। শনিবার সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

বার্ষিক চালের চাহিদা ও হাওরের ভূমিকা

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ মেট্রিক টন চালের প্রয়োজন হয়। বোরো মৌসুমেই জাতীয় গোলায় ৬০ ভাগ ধান জমা হয়, যার ২০ ভাগ আসে হাওর থেকে। নিজ এলাকার জন্য রেখে শুধু সুনামগঞ্জের হাওরে চাষ করা ধান জাতীয় খাদ্যভাণ্ডারে জমা করা হয় ছয় লাখ মেট্রিক টন। ফাল্গুন থেকে বৈশাখের নানা মাত্রার বর্ষণে আজ একের পর এক তলিয়ে গেছে হাওরের এই শস্যভাণ্ড।

ত্রিমুখী সংকটের বিবরণ

পাভেল পার্থ, যিনি ১৯৯৮ সাল থেকে হাওরে কাজ করছেন, তিনি হাওরের তিনটি সংকট চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটি স্থানীয়: সীমানা-দ্বন্দ্ব, অন্যায় ইজারা, দখল-বাণিজ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়নে ক্ষমতা ও স্বজনপ্রীতি। দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রীয়: কৃষি, জলাভূমি, বাস্তুতন্ত্র, প্রাণবৈচিত্র্য, জলাবন, প্রতিবেশবিনাশী উন্নয়ন, করপোরেট বাজার ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ঘিরে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব। তৃতীয়টি আন্তরাষ্ট্রিক: উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় ও আসামে বনভূমি বিনাশ, বহুজাতিক খনন, বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অভিন্ন নদীপ্রবাহের জুলুম। অমীমাংসিত কাঠামোগত বৈষম্য, বৈশ্বিক নয়া উদারবাদ এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের ভেতর এই ত্রিমুখী সংকট আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাচইরা বছর ও জলাবদ্ধ বন্যা

হাওরে তিন ধরনের বন্যা হয়। ঋতুভিত্তিক বন্যা, উজানের পাহাড়ি ঢলের উব্দা বা হড়কা বন্যা, আর অকাল বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধ বন্যা। ফাল্গুন থেকে বৈশাখ পর্যন্ত বোরো মৌসুমে টানা বৃষ্টিকে হাওরে ‘কাচইরা বছর’ বলে। চলতি ১৪৩৩ বাংলা এমনই এক কাচইরা বছর। ১৯৭৪ সালও ছিল বিনাশী কাচইরা বছর। ২০১৭ সাল থেকে জলাবদ্ধ বন্যার বিস্তার ও মাত্রা বাড়ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লোকায়ত জ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক পূর্বাভাসের সমন্বয়

খনার বচন, পই, প্রবাদ, ডাক-ডিঠান ছিল হাওরবাসীর কাছে দুর্যোগ-পূর্বাভাসের পঞ্জিকা। গ্রামীণ প্রবাদকে হাওরে বলে ‘ছৈলাপ’। সুনামগঞ্জের সজনার হাওরে শোনা এক প্রাচীন ছৈলাপ জানায়, ‘পুবের ধনু নিত্যি বর্ষে, পশ্চিমের ধনু সাগর শুষে,/ উত্তরের ধনু বায় বাণ,/ দক্ষিণের ধনু খায় ধান।’ এবার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকেই অনেক হাওরে বৃষ্টির দমক এসেছে। হাওর বাঁচাতে প্রাতিষ্ঠানিক পূর্বাভাসের সঙ্গে লোকায়ত জ্ঞানের সমন্বয় জরুরি।

বাঁধ-বাণিজ্য ও শাহ আবদুল করিমের গান

পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল চেরাপুঞ্জির ভাটিতে বাংলাদেশের হাওর। দেশের সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল শ্রীমঙ্গলও হাওরাঞ্চলে। পাউবোর (২০২৫) জরিপমতে দেশে ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদীর ভেতর সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বাধিক ৯৭টি নদী আছে। কিন্তু পানির এত প্রাকৃতিক আধার থাকার পরেও হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধ-বন্যা বাড়ছে কেন?

শাহ আবদুল করিমের (১৯১৬-২০০৯) গানে হাওরের বন্যার পরিবর্তন, সংকট ও কারণগুলো পাওয়া যায়। তিনি এই বন্যাকে ‘ভেজাইল্যা বন্যা’ বলেছেন। ১৯৭৪ সালে হাওরের বন্যা নিয়ে তাঁর একটি গানে তিনি বলেন, ‘চৈত্র মাসে বৃষ্টির জলে নিল বোরো ধান,/ ভেবে মরি হায় কী করি, বাঁচে কি না প্রাণ/ এই দেশেতে ফসল রক্ষা বড়ই বিভ্রাট।/ দেশের যত নদ–নালা হয়েছে ভরাট/ বৃষ্টি হইলে কূল ডুবাইয়া নদীর পানি হাওরে চলে,/ ফসল নিল সমূলে’।

হাওরে জলাবদ্ধ-বন্যার কারণ মূলত নদী, বিল ও জলাভূমি ভরাট। হাওরের কান্দা থেকে ধাপে ধাপে বিল পর্যন্ত ভূমির শ্রেণি উন্নয়নের নামে পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতাকাঠামো আর হাওরবিমুখ প্রকৌশলীরা হাওরের জলপ্রণালি ও বাস্তুতন্ত্রকে চুরমার করে অপরিকল্পিত রাস্তা, অবকাঠামো আর বাঁধ নির্মাণ করেছেন। পাউবোর হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৬—এই তিন অর্থবছরে কেবল সুনামগঞ্জ জেলায় ২ হাজার ১৩৬টি ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে ৯৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৮ ঘনমিটার মাটি। এই পরিমাণ মাটি দিয়ে ৩ হাজারের বেশি পুকুর ভরাট করে ফেলা সম্ভব। টাঙ্গুয়ার মতো আয়তনের কোনো হাওরের প্রায় ৪ ইঞ্চি পুরু কিংবা কোনো নদীর ১০ কিলোমিটার এলাকা ভরাট করে দিতে পারে ওই মাটি।

গভীর পানির ধানের শক্তি

১৯৩৪ সালে হাওরে, হবিগঞ্জের নাগুড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান’। গচি, রাতা, টেপী, বইয়াখাওরী, গদালাকি, সমুদ্রফেনা, সকালমুখী, হাতিবান্ধা, চুরাক, লাখাইয়ের মতো গভীর পানির ধানের জন্ম হাওরে। রাষ্ট্র হাওরের সেই শক্তি ও মর্যাদাকে ধরে রাখেনি। ‘সবুজ বিপ্লব প্রকল্প’ হাওরেও চাপিয়ে বিষনির্ভর উফশী ও হাইব্রিড বীজের সাম্রাজ্য। স্থানীয় জাতের ভেতর আগাম, বন্যা–সহিষ্ণু ও শিলাবৃষ্টি–সহিষ্ণু জাত আছে। হাওরের শক্তিময় জাতগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও চাষের ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া দরকার।

নয়নভাগার কষ্ট ও জাতীয় ধানকাটা বর্ষপঞ্জি

‘নয়নভাগা’ নামে এক নিদারুণ ভাগপ্রথা আছে হাওরে। চোখের সামনে বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ধান বাঁচাতে অনেক শ্রমিক নয়নভাগাতে ধান কাটেন। কাটা ধানের এক ভাগ কৃষক পান আর কৃষিশ্রমিক পান এক ভাগ। হাওরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে শ্রমিকের সংকট। চলতি মৌসুমে নয়নভাগাতে কাটার জন্যও শ্রমিক মিলছে না। হার্ভেস্টার মেশিনগুলো পানি বা কাদাজমিতে নামতে পারে না। উঁচু চাকার হার্ভেস্টার ও ধান শুকানোর যন্ত্রের দাবি তুলেছেন অনেকে।

হাওরসহ দেশের সব অঞ্চলের ধান কাটার সময় বিবেচনা করে একটি ‘জাতীয় ধানকাটা বর্ষপঞ্জি’ প্রস্তুত করা দরকার। দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এর কার্যকর প্রচারণা সম্ভব। ধানকাটাসহ কৃষিকাজকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে তরুণ উদ্যোক্তারাও নিতে পারেন।

উপসংহার

হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতা চিত্ত রঞ্জন তালুকদারের মতে, ১৯৬০ সালে হাওরে বন্যা হলেও বিল ও নদীগুলো গভীর থাকায় কোনো ফসলের জমি তলায়নি। মানুষও ঢাল হয়ে রক্ষা করেছিল ফসল। তলিয়ে যাওয়া হাওরকে বুঝতে হলে রাষ্ট্রকে এর মর্ম ধারণ করতে হবে। আশির দশক থেকেই হাওরের ত্রিমুখী সংকটের আলাপ জারি আছে, কিন্তু ‘ভাসান পানির আন্দোলন’সহ কৃষক আন্দোলনের দাবি রাষ্ট্র আমলে নেয়নি। ‘হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের’ মতো স্থবির প্রতিষ্ঠান নয়, দরকার আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও সর্বজনের অংশগ্রহণে নানা মেয়াদি হাওরমুখী তৎপরতা।