সিলেটে সড়ক পরিবহন আইন মানছেন না ডিআই পিকআপের চালকরা। আইনভঙ্গের কারণে এই ধরনের পিকআপ দুর্ঘটনায় পড়ে প্রায়ই অনেক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। রবিবার ভোরে সিলেটের সড়কে যে ৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে তা এই পিকআপের কারণেই। এর আগে ২০২৩ সালের ৭ জুন সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের নাজিরবাজারে ১৫ শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
আইন অমান্য ও দায়িত্বহীনতা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের যানবাহনের চালকরা মানুষের জীবন নিয়ে তাচ্ছিল্য করছে। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৪৯(১)(ঝ) ধারায় উল্লেখ আছে, মোটরযানের সামনে, পেছনে, উভয় পাশে, বাইরে বা ছাদে যাত্রী ও কোনও প্রকার পণ্য বহন করা যাবে না। কিন্তু, মামলা-জরিমানা করেও এ ধরনের যানবাহনে যাত্রী পরিবহন বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) ডেপুটি কমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় পিকআপ ভ্যানে কিংবা ট্রাকে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। রবিবারের দুর্ঘটনার পর থেকে এ বিষয়ে অভিযান শুরু করেছেন জানিয়ে তিনি জানান, রাস্তায় যাতে যাত্রী নিয়ে এ ধরনের যানবাহন চলাচল করতে না পারে সে বিষয়ে এসএমপির ট্রাফিক বিভাগ দায়িত্ব পালন করবে। সে ব্যাপারে তারা পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
হাইওয়ে পুলিশ সিলেট রিজিওনের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম বলেন, ‘এ নিয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সব সময় সচেতনতা কর্মসূচি পালন করা হয়। কিন্তু, কেউ নিয়ম মানতে চায় না। এমনিতে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের অবস্থা খারাপ। তার ওপর ফিটনেটবিহীন গাড়ি চলাচল ও যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার।’ এ ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির তাগিদ তার।
চালকদের তৎপরতা ও যোগসাজশ
সিলেট নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের (টিআই) দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘খরচ বাঁচানোর জন্য ডিআই পিকআপের চালকরা মিক্সার মেশিন ও নিরীহ শ্রমিকদের একসঙ্গে গাড়িতে তোলেন। এর সঙ্গে ঠিকাদার, বিল্ডিংয়ের মালিকপক্ষের যোগসাজশ রয়েছে। তারা খরচ বাঁচানোর জন্য মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।’
বিধান আছে, ডিআই পিকআপে বালু-পাথর পরিবহন করা হলেও তা যেন ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যাতে বাতাসে উড়ে এসব কারও গায়ে না পড়ে। কিন্তু, সিলেটে কোনও চালকই এসবের তোয়াক্কা করেন না। উপরন্তু, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে গেলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সার্জেন্টরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে গেলে তারা আরও মারমুখী হয়ে ওঠেন। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তারা আন্দোলনে নামেন।
টিআই আরও বলেন, ‘সিলেট নগরীর আম্বরখানা, কালীঘাট, চাঁদনীঘাট, সিলেট সরকারি কলেজ, তামাবিল রোড, মেন্দিবাগ সব্জিবাজারে পিকআপের চালকদের অস্থায়ী স্ট্যান্ড রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অভিযান চালিয়েও তাদের উচ্ছেদ করা যায়নি। সিলেটে কৃত্রিম যানজট সৃষ্টির পেছনে দায়ী এসব পিকআপ।’ বিআরটিএও এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে কোনও অভিযানে যায় না বলে তার অভিযোগ।
ঠিকাদার ও ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য
সিলেট ঢালাই সমিতির সেক্রেটারি রেণু ভূঁইয়া জানান, ২০২৩ সালের দুর্ঘটনার পর তারা সংশ্লিষ্টদের একই গাড়িতে মিক্সার মেশিন ও মানুষ না তোলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিছুদিন মানার পর কেউ আর সেটি মানছে না। যে কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটছে। রবিবার যে ঠিকাদার শ্রমিক ও মিক্সার মেশিন নিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে, তারা তাদের সংগঠনের কেউ না।
দক্ষিণ সুরমা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার টিটপ শিকদার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলোচনার বরাত দিয়ে জানান, খাগড়াছড়ি থেকে সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা কাঁঠালভর্তি ট্রাকটি মূলত হেলপার চালাচ্ছিলেন। তার ঝিমুনিভাবের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তারা ধারণা করছেন। খবর পেয়ে তাদের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। দুর্ঘটনার পর ট্রাকচালক ও হেলপার পালিয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
দুর্ঘটনার বিবরণ
প্রসঙ্গত, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজারে রবিবার সকালে ট্রাক ও ডিআই পিকআপ সংঘর্ষে ৮ নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো কয়েকজন শ্রমিক। আরও খবর: ঘুমে ঝিমিয়ে ট্রাক চালাচ্ছিলেন হেলপার, পিকআপের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৯।



