ভাসমান জেলেদের জীবনসংগ্রাম: অবহেলার শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী
ভাসমান জেলেদের জীবনসংগ্রাম: অবহেলার শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

পটুয়াখালীর গলাচিপায় আগুনমুখা নদীর তীরে ভাসমান নৌকায় বসবাস করা জেলেদের রূঢ় জীবনসংগ্রাম আমাদের একটি চরম অবহেলিত প্রান্তিক সমাজের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, গলাচিপা উপজেলার বোয়ালিয়া স্পিডবোট ঘাটে দুই শতাধিক ছিন্নমূল পরিবার যুগ যুগ ধরে নৌকাকেই ঘরবাড়ি বানিয়ে টিকে আছে। জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে নিত্য লড়াই করে যাঁরা দেশের মৎস্য খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নীরবে অবদান রাখছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, খোদ রাষ্ট্রই তাঁদের ন্যূনতম স্বীকৃতিটুকুও দিতে পারেনি।

নারী ও শিশুদের দুর্ভোগ

এসব ভাসমান মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু। বৈরী আবহাওয়া ও প্রমত্ত নদীর বড় বড় ঢেউয়ের মধ্যেই শাবানা, আলেয়া, রেহেনা কিংবা শেফালির মতো নারীদের হাতে তুলে নিতে হচ্ছে জীবনতরির বইঠা। অসুস্থ স্বামী বা পরিবারের উপার্জনের তাড়নায় তাঁরা কোলের শিশুটিকেও নৌকার এক কোণে বসিয়ে মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন।

শিশুশ্রম ও শিক্ষার অভাব

অভাবের তাড়নায় স্কুলমুখী হওয়ার বদলে ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদেরও পরিবারের সঙ্গে জাল ফেলতে হচ্ছে উত্তাল নদীতে। ছোট্ট রুমান কিংবা জাহাঙ্গীরের মুখে যখন শোনা যায়, ‘ঘরে ভাত না থাকলে স্কুল দিয়া কী করমু? স্কুলে গেলে খাওয়া দেবে কেডা?’—তখন প্রাথমিক শিক্ষাকে শতভাগ নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় স্লোগানগুলোর দুর্বলতাই প্রকট হয়ে ওঠে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশাসনিক অন্ধত্ব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

মর্মান্তিক এই বেঁচে থাকার লড়াইয়ের চেয়েও হতাশার জায়গাটি হলো প্রশাসনিক অন্ধত্ব। দীর্ঘকাল ধরে নদীতে মাছ ধরলেও এদের নামের পাশে সরকারিভাবে ‘জেলে’ তকমাটি আজও জোটেনি। কারণ হিসেবে স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তা ও প্রশাসন বলছে, এসব জেলের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। আর জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য দরকার বাড়ির হোল্ডিং নম্বর ও জনপ্রতিনিধির প্রত্যয়নপত্র। জীবন যাঁদের নিরন্তর ভাসে নদীর জলে, ডাঙায় যাঁদের এক ছটাক মাটিও নেই, তাঁদের কাছে বাড়ির হোল্ডিং নম্বর চাওয়াটা চরম অযৌক্তিক। এটি স্পষ্টতই আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ, যার বেড়াজালে আটকে হতদরিদ্র এই মানুষগুলোকে সরকারের ভিজিএফ চাল থেকে শুরু করে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর সুবিধা থেকে দিনের পর দিন বঞ্চিত করা হচ্ছে।

অবিলম্বে পদক্ষেপের দাবি

শুধু কাগজের নিয়মের দোহাই দিয়ে প্রকৃত জেলেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা অমানবিক। মৎস্য বিভাগ ‘বিশেষ বিবেচনায়’ তাঁদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার যে কথা বলেছে, তার অবিলম্বে দৃশ্যমান বাস্তবায়ন দেখতে চাই আমরা। কেবল জেলের স্বীকৃতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; ভাসমান এই পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে নারীদের ঋণসুবিধা প্রদান এবং কোমলমতি শিশুদের শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করে স্কুলে ফেরাতে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। কাঠামোগত এই অবহেলার দ্রুত অবসান হোক।