শ্রম-শোষণের বিশ্ব ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ছেদ করে একদিন বদলের বাস্তবতা এনেছিল মে দিবস। রাজপথে বিসর্জিত শ্রমিকের রক্তে একদিন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হয় ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি। ১ মে স্বীকৃতি পায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে এদিন সাধারণ ছুটি। তবে, রাজধানী ঢাকার সদরঘাটের নৌকা চালকরা জানেন না মে দিবস কী, এই দিনের তাৎপর্যই বা কী। তাদের কাছে এই ছুটির দিনটি বোঝা। কেননা এদিন কাজ মেলে না বলে পয়সাও মেলে না।
বুড়িগঙ্গার তীরে সদরঘাটের নৌকা চালকদের দুর্দশা
বুড়িগঙ্গার তীরে সদরঘাটে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, ঘাটে অনেক নৌকা পড়ে আছে। মাঝিরা জানান, এখন আর দূরের পথে নৌকা চলে না, শুধু খেয়া পারাপারেই সীমাবদ্ধ তাদের কাজ। ফলে আয় আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। একদিন নৌকা না চালালে পেটে ভাত পড়ে না।
ফজলু মিয়ার গল্প: নৌকাই তার সন্তান
সদরঘাটের মাঝি ফজলু মিয়া। কথা হলে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় শ্রমিক দিবস নিয়ে। তবে, এই দিবস কী তা জানেন না তিনি। ফজুল মিয়া জানান, নৌকাটা তার কাছে সন্তানের মতোই প্রিয়। বুড়িগঙ্গার বুকে এই নৌকা চালিয়েই কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ সময়। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো শক্তিশালী না থাকলেও থেমে থাকেননি তিনি। প্রতিদিনের মতো এখনও ভোর হলেই নেমে পড়েন নদীতে। কারণ, এই নৌকাই তার একমাত্র উপার্জনের ভরসা।
নদীর পাড়ে বসে নৌকার পাটাতন মেরামত করছিলেন ফজলু মিয়া। পুরোনো কাঠ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলোর জায়গায় নতুন কাঠ বসাচ্ছেন যত্ন করে। হাতে কাঁপুনি আছে, কিন্তু কাজের প্রতি মনোযোগে কোনও ঘাটতি নেই। দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “নৌকাটা যদি নষ্ট হয়, মনে হয় আমিও ভেঙে পড়ি। এটাকে ঠিক না করে কীভাবে থাকি? নদীর জলেই তার পথচলা।”
কুদ্দুসের আক্ষেপ: আগের মতো আয় নেই
আরেক মাঝি কুদ্দুস আক্ষেপ করে বলেন, “আগে সারা দিন নৌকা চালিয়ে ভালোই আয় হতো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যাত্রী থাকতো, বসে থাকার সময়ই পেতাম না। তখন সংসারটা মোটামুটি স্বচ্ছলভাবেই চলতো। কিন্তু, এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। আমরা শুধু মানুষ খেয়া পারাপার করি। তাতেও যাত্রী আগের তুলনায় অনেক কম। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। কোনও যাত্রীই পাওয়া যায় না। দিনে যা আয় হয়, তা দিয়ে ঠিকমতো সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।”
মে দিবস কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, “টিভিতে দেখি মে দিবস আসে, শ্রমিকদের কথা বলা হয়। কিন্তু, আমাদের জীবনে এর কোনও পরিবর্তন আসে না। আমরা তো প্রতিদিনই শ্রম দেয়, কিন্তু সেই পরিশ্রমের কোনও নিশ্চয়তা নাই। কাজ না করলে আয় নেই, আর আয় না থাকলে সংসার চলে না। আমাদের জন্য আলাদা কোনও অধিকার বা সুবিধা আছে বলেও মনে হয় না।”
রহিম উদ্দিনের কথা: মে দিবস মানে আয় বন্ধ
আরেক মাঝি রহিম উদ্দিন বলেন, “সংসার চালাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে যা আয় করতাম, তাতে কোনোভাবে দিন পার করতাম। এখন নৌকা না চালালে পেটে ভাতই যায় না। কিন্তু সমস্যা হলো, চালাতে গেলেও আগের মতো কাজ নেই। যাত্রী কম, আয় কম সব মিলিয়ে খুব কষ্টে আছি।”
মে দিবস নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মে দিবসের কথা শুনি, মানুষ ছুটি পায়। কিন্তু, আমাদের জন্য এই দিনটা আরও কঠিন। সেদিন কাজই থাকে না, আয়ও হয় না। আমরা তো প্রতিদিনই শ্রম দেয়, কিন্তু আমাদের কষ্টের কোনও আলাদা মূল্য কেউ দেয় না। আমাদের কাছে মে দিবস মানে ছুটি না, বরং একদিনের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া।”



