লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত পুষ্টিকর দুধ, ডিম ও বিস্কুট সরবরাহ না করে তাদের দেওয়া হচ্ছে পচা কলা ও বাসি বনরুটি। এমনকি প্রকল্পের খাবার খোলা বাজারে বিক্রির সময় এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীকে হাতেনাতে ধরা পড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা
উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মোট ৯৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৭ হাজার ২৬৪ শিক্ষার্থীর জন্য এ প্রকল্প চালু রয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, সপ্তাহে পাঁচদিন শিক্ষার্থীদের ফর্টিফাইড বিস্কুট, ডিম, বনরুটি, মৌসুমী ফল ও পাস্তুরিত তরল (UHT) দুধ দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ বিদ্যালয়েই এসব খাবারের দেখা মিলছে না।
শিক্ষকদের অভিযোগ
পশ্চিম আলেকজান্ডার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অর্চনা দাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'রোস্টার অনুযায়ী দুধ, ডিম ও বিস্কুট দেওয়ার কথা থাকলেও আমার স্কুলে শুধু নিম্নমানের কলা ও বনরুটি দেওয়া হয়েছে। একদিনের জন্যও বিস্কুট মেলেনি। কলার অবস্থাও খাওয়ার অনুপযোগী।' একই অভিযোগ লোকমাননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মঞ্জুর হোসেনের। তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ে খাবার না পৌঁছে ঠিকাদার খাবার সরবরাহ করেন দুপুরে, যার ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী টিফিন না খেয়েই বাড়ি ফিরে যায়।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তালিকায় পুষ্টিকর খাবারের কথা থাকলেও তাদের দেওয়া হচ্ছে দুর্গন্ধযুক্ত ডিম এবং ফরমালিনযুক্ত পচা কলা। অনেক সময় বনরুটিতে পোকাও পাওয়া যাচ্ছে। এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে অনেক শিশু পেটের পীড়াসহ নানা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে।
খোলা বাজারে খাবার বিক্রি
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে আলেকজান্ডার বাজারের সমবায় এলাকার কয়েকটি দোকানে স্কুল ফিডিংয়ের জন্য বরাদ্দকৃত কলা খোলা বাজারে বিক্রি করার সময় স্বদেশ প্ল্লী নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীকে হাতেনাতে ধরেন স্থানীয় জনতা। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঠিকাদারদের বক্তব্য
অনিয়মের বিষয়ে টিফিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ক্লাস্টার সুপারভাইজার ইমন হোসেন দুধ ও বিস্কুট সরবরাহ না করার কথা স্বীকার করে বলেন, 'আমি নতুন যোগদান করেছি। তবে শুনেছি আগে কলার মান খারাপ ছিল, আশা করি এখন আর সমস্যা হবে না।' অন্যদিকে একই প্রকল্পের আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যারাগন এগ্রো লিমিটেডের সহকারী সুপারভাইজার মো. জাহিদ হাসান জানান, চলতি মাসের ২০ ও ২৭ তারিখের দুধ সরবরাহ করার কথা থাকলেও ঠিকাদার তা দেননি। তবে উপজেলা শিক্ষা অফিসার তাকে ২০ তারিখের বকেয়া দুধ সরবরাহ করতে নিষেধ করেছেন।
কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মু. সাইদুর রহমান স্বপন কিছু বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও নিম্নমানের খাবার সামগ্রী সরবরাহের সত্যতা স্বীকার করেন। তবে বকেয়া থাকা ২০ তারিখের দুধ দিতে বারণ করার বিষয়ে তিনি বলেন, 'অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেই আমি নিষেধ করেছি।' রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, 'প্রকল্পটি শিশুদের পুষ্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ে অনিয়ম বা পচা খাবার বিতরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে এই মহতী উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে বসেছে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।



