চৈত্র-সংক্রান্তির পর থেকে তপ্ত ঝাঁঝালো হয়ে ওঠে আবহাওয়া। মাটি থেকে ওড়ে যায় রস, বুকের ছাতি শুকায়। সময়টা কালবৈশাখীর, কিন্তু সম্প্রতি বাড়ছে বজ্রপাতও। একটা সময় বাংলা অঞ্চলের ব্যস্ততম কৃষি মৌসুম ছিল আমন। কিন্তু বর্তমানে বোরোই হয়ে উঠেছে দেশের ব্যস্ততম কৃষি মৌসুম। চৈত্র-বৈশাখে তাই ঘুম নেই কৃষকের। ঋণকর্জ কী জবরদস্ত খাটাখাটনি করে আর বালাই-বিপদ ঠেলে কোনো মতে ফসলের জান বাঁচানোই একমাত্র নিয়তি। বরেন্দ্র অঞ্চলে সকালের খাবারকে বলে ‘লাহির’। দেশের সব এলাকার মতোই বরেন্দ্র এলাকার কৃষকেরও এখন লাহিরের সময় হচ্ছে না। তেলের জন্য খালি পেটে পাম্পের পর পাম্পে ছুটছেন কৃষক। বিমর্ষ ও ব্যর্থ শরীর নিয়ে দেশব্যাপী দীর্ঘতর হচ্ছে তেলের জন্য অপেক্ষার প্রহর।
তেলের লাইনে এক কৃষকের মৃত্যু
রাজশাহীর মোহনপুরের কেশরহাটে তেল নিতে এসেছিলেন এমনই এক দীর্ণ প্রবীণ কৃষক—বাকশৈল গ্রামের আব্দুল কালাম আলাউদ্দিন। ষাটোর্ধ বয়স হলে কী হবে? রাষ্ট্র তো বয়স্ক কৃষকদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করেনি। বয়স যাই হোক—খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় যাই হোক, তেল বা বীজ কী বিষের জন্য কৃষককে লাইন দিতেই হবে। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য তারও তেল দরকার ছিল। মেশিন ছাড়া সেচের পানি তোলা যায় না বরেন্দ্র অঞ্চলে। আর তেল ছাড়া মেশিন অচল। বাংলাদেশে তো তেলের খনি নেই। পুরোটাই আমদানি-নির্ভর। ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধের কারণে তেল আসছে না। আবার বলাবলি হচ্ছে, তেল লুকিয়ে দাম বাড়িয়ে তেল-সংকট তৈরি করছে মুনাফাখোর সিন্ডিকেট। এসব বয়ান আর বাহাস বিশ্বাস অবিশ্বাস করা বা তর্কে জড়িয়ে পড়ার সামর্থ্যও নেই আলাউদ্দিনদের। তাদের একমাত্র আশা, পিপাসার্ত ফসলের জমিন বাঁচানো। অন্যের খাবারের থালা নিরাপদ রাখা। তাই বহু কৃষক আর মোটরসাইকেলের লম্বা লাইনে সকাল থেকে খালি ডিব্বা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনিও।
রোদের তাপ বাড়তে থাকে আর তেলের লাইন দীর্ঘতর হয়। সেচের দুশ্চিন্তায় ঘামে জবজব আলাউদ্দিন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। তেলের লাইনেই লুটিয়ে পড়েন কেশরহাট ফিলিং স্টেশনে। মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার পর দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানান, তিনি মারা গেছেন। মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, কৃষক আলাউদ্দিন ‘হিটস্ট্রোকে’ মারা গেছেন। গণমাধ্যম আরও জানায়, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং পরিবারের কোনো ‘অভিযোগ’ না থাকায় মরদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু কীসের অভিযোগ করবেন পরিবার? কার বিরুদ্ধে অভিযোগ? যুদ্ধ নাকি তেল-গ্যাস-কয়লা মানে জীবাশ্মজ্বালানি নির্ভর কৃষিব্যবস্থার বিরুদ্ধে? রাষ্ট্র কি এই অভিযোগ আমলে নেবে? রাষ্ট্র কি যুদ্ধ-উন্মত্ত অস্ত্র কোম্পানির বাণিজ্য কিংবা তেলনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করবে?
জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর কৃষির কাঠামোগত সংকট
যুদ্ধ শুরুর পর, হরমুজ প্রণালি বিতর্ককে চারধারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হরমুজ তর্ককে সামনে রেখে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর নিওলিবারেল সভ্যতার সংকটকে আড়াল করা যাবে না। মাটির তলার তেল না তুলে কৃষি উৎপাদন ও জীবনযাপন নিয়ে আমাদের এই সময়টাতেই আলাপ জোরালো করা দরকার। ধরা যাক, যদি পৃথিবী আজ জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর না হতো, সবাই সবুজ বা নবায়নমুখী জ্বালানি ব্যবহার করতো, তবে কি হরমুজ প্রণালি শাসন বা দুঃশাসনের চাপ এক গরিব কৃষক আলাউদ্দিনকে মেরে ফেলতে পারতো? পারতো না। কারণ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় তখন আলাউদ্দিনদের সিদ্ধান্ত ও অংশগ্রহণ থাকতো। কৃষক আলাউদ্দিনের মৃত্যু ওরফে ‘হিটস্ট্রোক’ নয়, এটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। কারণ নিওলিবারেল কাঠামোই জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে কৃষকদের ওপর জারি রেখেছে। রাষ্ট্র এই ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়ে এসেছে ষাটের দশক থেকেই। তাহলে আজ কাল বা পরশু যখনই তেলের টান পড়বে, তখন আলাউদ্দিনদের জীবন হাতে নিয়েই লাইনে দাঁড়াতে হবে। হয় রক্তাক্ত হয়ে তেল নিয়ে জমিনে ফেরা যাবে, কিংবা তেল না পেয়ে লাশ হতে হবে। এই দুই নির্মমতা ছাড়া কৃষিজীবনের আর কোনো পথ আজ আর খোলা নেই। জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতাই আজ কৃষকের ওপর এই অন্যায় বাইনারি চাপিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্র অন্য কোনো বিকল্প নিরাপদ স্বনির্ভর কৃষি কারিগরিকে উৎসাহিত করেনি।
সবুজ বিপ্লবের ভূমিকা
কেবল সেচকাজ নয়, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের প্রায় পুরো ব্যবস্থাটিই আজ জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর। তেলের অভাবে তাই এবার কৃষি যন্ত্রপাতির বৈশাখী বাজারও জমেনি। ধানকাটা হার্ভেস্টার, শ্যালো মেশিন, পাওয়ার টিলার, ধান মাড়াইসহ যন্ত্রপাতিগুলো অলস পড়ে আছে। তাপে পুড়ছে জমিন। বোরো মৌসুমেই এই তেলের যন্ত্রণা তীব্র হয়। বাংলাদেশকে ৩০টি কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। দেশের সব এলাকার জমির ধরন একরম নয়। এসব জমির ধরন অনুযায়ী এলাকাভিত্তিক স্থানীয় ধান জাতের বৈচিত্র্য ছিল আগে। কিন্তু সবুজ বিপ্লব প্রকল্পের মাধ্যমে সেসব অবিস্মরণীয় জাতদের খুন করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে কৃষিতে মনোপলি বীজ ও মনোপলি করপোরেট বাজারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে—বোরো মৌসুমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ধান আগে ওঠে এবং ক্রমান্বয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ধান দেরিতে পাকে। কিন্তু সর্বত্রই বোরো মৌসুমে ধান আবাদের জন্য যন্ত্রনির্ভর পাতালপানি সেচ ব্যবহার করা হয়। তাই যুদ্ধ-আক্রান্ত সময়ের তেল সংকটে ক্রমাগত সেচ সংকট শুরু হয়েছে। আবার একইসঙ্গে এই যন্ত্রনির্ভর সেচের জন্য সবুজবিপ্লব প্রকল্পের দায় অনেক। তাই যুদ্ধ ও সবুজ বিপ্লব উভয় প্রবণতাকেই চলমান জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর কৃষির সংকট হিসেবে পাঠ করতে হবে।
ধান গাছ খুব নাজুক প্রকৃতির। বীজ দানা থেকে চারা, চারা থেকে যৌবন, গর্ভসঞ্চার থেকে আবার জীবদানা সমগ্র জীবনচক্রে ধানের জন্য মাটিতে রস থাকা দরকার। কিন্তু সবুজ বিপ্লব পরবর্তী কৃষি ব্যবস্থায় সিনথেটিক সার-বিষ ঢেলে এবং পাতালপানি তুলে মাটির হিউমাস মেরে ফেলা হয়েছে। সবুজ বিপ্লব প্রকল্প আমাদের জমিনগুলোকে পিপাসার্ত বানিয়েছে। এমনকি স্থানীয় শস্য ফসলের জাতদের হটিয়ে তথাকথিত উচ্চফলনশীল (উফশী), হাইব্রিড এবং জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফসলের একছত্র অনুমোদন পানির ব্যবহারকে বাড়িয়েছে। কারণ এসব বীজ ও জাত প্রবলভাবে উচ্চমাত্রায় পানিগ্রহণশীল। বলা যেতে পারে উগ্রশী (উচ্চ গ্রহণশীল)। নদী, নালা, খাল, খাঁড়ি, ঝিরি থেকে সেচের পানি সংগ্রহের চল শুরু হলেও বর্তমানে যন্ত্রনির্ভর পাতালপানিই একমাত্র ভরসা। আর এই যন্ত্রগুলো চালু করতেই দরকার জীবাশ্ম জ্বালানি। যুদ্ধ যদি থেমেও যায়, হরমুজ যদি খুলে যায়, আলাউদ্দিনদের কি তেলের জন্য আজীবন অপেক্ষা করতে হবে? হয়তো আবার কোনো যুদ্ধ পাতানো হবে, আবার কোনো হরমুজ রুদ্ধ হবে, আবারও দীর্ঘ হবে তেলের লাইন। আবারও কোনো আলাউদ্দিন ঢলে পড়বেন জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার দগ্ধ ময়দানে।
পানির সংকট ও কৃষকের আত্মহত্যা
লাগাতার যন্ত্র দিয়ে পানি তুলতে তুলতে দেশ আজ পাতালপানি শূন্য হতে চলেছে। গ্রামে গ্রামে মানুষ প্রতিবছর পানির খোঁজে জমির সুড়ঙ্গ খুঁড়ে গভীর থেকে গভীরে ঢুকছে। তাও মিলছে না পানি। রাষ্ট্র ইতোমধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের হাজার হাজার গ্রামকে পানিশূন্য এবং সংকটনাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে। প্রতিদিন বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি নিয়ে বাড়ছে নানামুখী বিরোধ, দ্বন্দ্ব এবং সংঘাত। এমনকি তেল কিংবা মেশিন চললেও সবাই পানি পায় না এখানে। আদিবাসী, গরিব, সামাজিকভাবে প্রান্তিক মানুষেরা হয় বঞ্চিত। এর আগে সেচের পানি না পেয়ে কৃষক আলাউদ্দিনের পাশের উপজেলা গোদাগাড়ীর সাঁওতাল কৃষক অভিনাথ মার্ডী, রবি মার্ডী ও মুকুল সরেন বিষ খেয়েছিলেন। অভিনাথ ও রবি মার্ডী মারা যান। এসব মৃত্যুকে নিছক ‘হিটস্ট্রোক’ বা ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে ওড়ায়ে দিয়ে কোনোভাবেই মর্মমূলের সমস্যাকে দূর করা যাবে না। কারণ সংকটটি তৈরি হয়ে আছে ষাটের দশকের সবুজবিপ্লব প্রকল্পের ভেতর দিয়ে— যা এখন আমাদের পরনির্ভর ও নিয়ন্ত্রিত এক কৃষি ও খাদ্যউৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। সবুজবিপ্লবের যন্ত্রণা এবং রাজনীতিকে সর্বদা আলাপে আনতে হবে। সবুজবিপ্লবের কারাগার রাষ্ট্রের কৃষি-মনস্তত্ত্ব এবং কৃষি-পরিকল্পনা থেকে সমূলে উৎখাত করতে হবে। তা না হলে অভিনাথ কী আলাউদ্দিন, কৃষকের মৃত্য থামবে না।
আমাদের কী কৃষক মিনারুলের কথা মনে আছে? রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় গ্রামের এক গরিব কৃষি মজুর মিনারুল ইসলাম। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট তার স্ত্রী মনিরা বেগম (২৮) এবং তাদের ছেলে মাহিন (১৩) এবং কন্যা মিথিলাকে (২) খুন করে নিজে আত্মহত্যা করেছিলেন। চিরকুটে তিনি লিখে রেখে গিয়েছিলেন, ‘… আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে’। এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের কুড়েরপাড় এলাকার আল আমিন ও তার স্ত্রী জরিনা খাতুন কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেন ২০২৫ সালের ২৬ মে। নাটোরের লালপুরের আড়বাব ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের গরিব কৃষক রইজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুন তামাক আবাদ করে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে আত্মহত্যা করেন ২০২৫ সালের ২ জুন। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মেহেরপুরের ভবরপাড়া গ্রামের কৃষক সাইফুল শেখ পেয়াঁজ চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন। একই কারণে রাজশাহীর বাঘার আড়ানী রেলস্টেশনের রেললাইনে শুয়ে পড়েছিলেন বাউসা ইউনিয়নের মাঝপাড়া গ্রামের কৃষক মীর রুহুল আমিন।
কল রেজিমেই কৃষকেরা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন এবং তাদের করুণ মৃত্যুও ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্র কৃষকদের আগলে দাঁড়ায়নি। অমীমাংসিত সব কৃষিপ্রশ্নকে রাষ্ট্রের দরজায় ছুড়ে দিয়ে করুণভাবে মরে যাওয়া কৃষকদের বাড়িতে আজ পর্যন্ত কোনো কৃষিমন্ত্রীকে আমরা যেতে দেখিনি। বিমর্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারদের পাশে কৃষি বিভাগ কেন দাঁড়ায় না? কৃষক কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা বিশ্বাস করতে চাই, কৃষক ভালো থাকবে, নিরাপদে থাকবে। কিন্তু এক আলাউদ্দিন ঢলে পড়েছেন তেলের লাইনে, বজ্রপাত কি বিষে দেশব্যাপী কৃষকের ঢলে পড়া থামছে না। রাষ্ট্র কি কৃষকের এই ঢলে পড়া থামাতে তৎপর হবে, দেশের জন্য, দশের জন্য?



