রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় মৃত অবস্থায় পড়ে থাকা ৬০ বছর বয়সী একটি পুরুষ হাতির শুঁড় ও পেছনের পায়ের বড় অংশ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল রোববার ভাসান্যা আদাম ইউনিয়নের পকসাপাড়ায় হাতিটির মৃতদেহ দেখতে পান বন বিভাগের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা। ওই সময় একটি স্ত্রী হাতি মৃত সঙ্গীকে পাহারা দিচ্ছিল এবং মানুষজনকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছিল না। কিন্তু স্ত্রী হাতি সরে যাওয়ার পর রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা হাতিটির শুঁড় এবং পেছনের পায়ের বড় অংশ কেটে নিয়ে যায়।
প্রজননক্ষম একমাত্র পুরুষ হাতি
বন বিভাগ জানিয়েছে, ওই এলাকার একমাত্র প্রজননক্ষম পুরুষ হাতিটি ছিল এটি। দুই বছর আগেও দুর্বৃত্তরা এটিকে গুলি করেছিল এবং ধারালো বর্শা দিয়ে আঘাত করেছিল। পরে বন বিভাগের চিকিৎসায় হাতিটি সুস্থ হলেও পুনরায় সংক্রমণ দেখা দেয়। সেই সংক্রমণ থেকেই হাতিটির মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও এর মাংস কেটে নেওয়ার দৃশ্য গতকাল রাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বন কর্মকর্তার বক্তব্য
পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, লংগদুর এই পুরুষ হাতিটি ছিল ওই এলাকার ১৪টি হাতির মধ্যে একমাত্র ব্রিডিং ক্ষমতাসম্পন্ন বড় পুরুষ হাতি। একটি গোষ্ঠীর হাতে সে গুলিবিদ্ধ হয়েছেও কয়েকবার। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাকে গুলি করা হয় এবং ধারালো বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে আঘাত করা হয়। তখন দুই দফা চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, স্ত্রী হাতিরা পালের বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ হাতির সঙ্গে মিলিত হতে পছন্দ করে। এখন ওই পালে আরও পুরুষ হাতি রয়েছে, কিন্তু তারা এখনো মিলনের জন্য উপযুক্ত হয়নি।
শরীরের ছয় জায়গায় গভীর ক্ষত
মৃত হাতিটির শরীরের অন্তত ছয়টি জায়গায় গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে। শরীরের পেছনের ডান পাশ, সামনের ডান ও বাঁ অংশ, সামনের বাঁ পায়ের জয়েন্টে ছিল ক্ষতগুলো। পায়ের জয়েন্টের ক্ষত এক হাত গভীর ছিল। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ বলেন, অসুস্থ অবস্থায় হাতিটিকে প্রথমে ২৩ ফেব্রুয়ারি এবং দ্বিতীয় দফায় ১০ এপ্রিল চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসাসেবা চলমান ছিল।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) চিকিৎসক বিবেক চন্দ্র সূত্রধর বলেন, হাতিটির বুকে দুটি ক্ষত এবং বাঁ পায়ের জয়েন্টে বেশি ক্ষত ছিল। শরীরের ক্ষত ভালো করা যেত, কিন্তু পায়ের ক্ষত বেশি হওয়ার কারণে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম।
ফেসবুকে ক্ষোভ
গতকাল ভোরে মৃতদেহ দেখা গেলেও ওই সময় হাতিটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। স্ত্রী হাতি পাহারা দেওয়ায় বন বিভাগের কর্মীরা কাছে যেতে পারেননি। স্থানীয় লোকজন স্ত্রী হাতিকে বালু-পাথর নিক্ষেপ এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করে বিরক্ত করার চেষ্টা করেন। স্ত্রী হাতিও তাদের দিকে তেড়ে যায়।
আজ দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত পুরুষ হাতিটির শরীর থেকে মাংস কেটে নেওয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে। হাতির শুঁড় ও পেছনের ঊরু কেটে নিয়েছে অজ্ঞাত লোকজন। এভাবে মাংস কেটে নিয়ে যাওয়ায় বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
হাতির ক্ষতবিক্ষত ছবি ফেসবুকে দিয়ে রিকোর্স চাকমা লিখেছেন, 'আমরা মানুষ হব কবে? ভিডিওটি যতবার দেখতেছি, ততবার নিজেকে ধরে রাখতে পারতেছি না। মানুষ এত জঘন্য। এটা কীভাবে সম্ভব। গতকাল রাঙামাটির লংগদুতে মৃত পুরুষ হাতিটির শুঁড় ও পায়ের মাংস রাতের অন্ধকারে কে বা কারা কেটে নিয়ে গেছে। বন বিভাগের দায়িত্বশীলরা কোথায় গেল?'
সমীর মল্লিক লিখেছেন, 'রাঙামাটির লংগদুতে মৃত হাতির পায়ের মাংস ও শুঁড় কেটে নিয়েছে মানুষরূপী কিছু হায়েনা! এর চেয়ে বীভৎস ঘটনা আর কি হতে পারে? গতকালই আমি লিখেছিলাম মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে শোকে কাতর সঙ্গী হাতিটিকে উত্ত্যক্ত করছে, ঢিল মারছে, লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছে। কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। রাতের বেলায় এসে দুর্বৃত্তরা হাতির শরীরের অংশ কেটে নিয়ে গেছে বন বিভাগ ও ইআরটি সদস্যরা কোথায় গেল?'
বন বিভাগের বক্তব্য
আজ দুপুরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো রফিকুজ্জামান শাহ প্রথম আলোকে বলেন, মৃত হাতিটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগ ও ভেটেরিনারি টিম সেখানে গেছে। হাতিটির ময়নাতদন্ত শেষে মাটিচাপা দেওয়া হবে।
হাতির মাংস ও শুঁড় কেটে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, 'গতকাল (রোববার) রাতে বৃষ্টি হওয়ার কারণে মানুষজন থাকার পরিবেশ ছিল না। ছোট হাতিটা সরে যাওয়ায় রাতের আঁধারে কে বা কারা হাতির মাংস কেটে নিয়ে গেছে সেটি জানা নেই। মানুষজন এত জঘন্য হয়ে গেছে বলার মতো না। এখানে আমাদের করণীয় কি আছে বলেন তো?'



