সুন্দরবনে ফুটেছে ছইলা ফুল, মধুগন্ধে ভরপুর বনাঞ্চল
সুন্দরবনে ফুটেছে ছইলা ফুল, মধুগন্ধে ভরপুর

খুলনার কৈলাশগঞ্জের কাছে সুন্দরবনে ছইলা ফুল ফুটতে শুরু করেছে। এই ফুলকে সুন্দরবনের সবচেয়ে সুন্দর ফুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত ২৯ মে সকালবেলায় খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জের নিকুঞ্জ ভ্যালি রিসোর্ট থেকে দেশি নৌকায় করে বিশ্বাসের খাল বেয়ে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশের সময়ই দেখা মেলে সেই সুন্দর ছইলা ফুলের।

ছইলা ফুলের সৌন্দর্য ও মধুগন্ধ

তখন তীব্র জোয়ারের স্রোত। নদীর ঘোলা পানির স্রোতের টানে নৌকা স্থির রাখা মুশকিল ছিল। তবে পাকা মাঝি পরিতোষ দাদার অনুরোধে নৌকা ঘুরিয়ে গাছটার কাছে নিয়ে যান। জ্যৈষ্ঠ মাস চলছে, এ সময় আম-কাঁঠালের মধুগন্ধে মাছিরা ভনভন করে। কিন্তু ছইলা ফুলের ঘ্রাণ ভারি মিষ্টি, আম-কাঁঠালের মতো তীব্র নয়।

ছইলা মধুর বিশেষত্ব

মাঝি জানান, ছইলাগাছে বুনো মৌমাছি এসে ফুলের মধু নিয়ে বনের ভেতরে চাকে জমায়। সেই মধুর স্বাদ-গন্ধ সবই আলাদা, যা ছইলা মধু নামে পরিচিত। ফুলের রং নদীর পানির ওপর দুলতে থাকা কেশরগুচ্ছের মতো সুন্দর। কুঁড়িগুলোও কম রূপবতী নয়, আঁটসাঁট গোলাপি চুলের খোঁপার মতো দেখায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছইলা গাছের বৈশিষ্ট্য

স্থানীয় লোকদের কাছে এ গাছ ছইলা নামে পরিচিত হলেও বইপত্রে এর কয়েকটি নাম পাওয়া যায়—ছৈলা, ওড়া ও চাক কেওড়া। ফল দেখতে চ্যাপটা গোলাকার লাটিমের চাকের মতো, তাই এ নাম। পরিপক্ব ফল স্বাদে টক, যা রান্না করে খাওয়া যায়। সুন্দরবন এলাকার মানুষ সেই ফল চিংড়ি মাছ দিয়ে রান্না করে খান। ছইলার ইংরেজি নাম Crab-apple mangrove, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Sonneratia caseolaris, গোত্র Lythraceae।

ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ হিসেবে ছইলা

ছইলা একটি প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ, সুন্দরবনের গাছ। গাছ চিরসবুজ, দ্রুতবর্ধনশীল, মাঝারি থেকে বড় আকারের বৃক্ষ। গাছ ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এ গাছের বাকল তরুণ অবস্থায় মসৃণ থাকে, পরে খসখসে হয়ে যায়। বাকলের রং ধূসর-বাদামি থেকে বাদামি। গাছের গোড়ায় ৫০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা চোখা লাঠির মতো শ্বাসমূল জন্মে। ফুল ফোটে সন্ধ্যাবেলা, ভোরে ঝরে যায়। ফুলে প্রচুর মধু হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফুল ফোটার সময় ও বৈশিষ্ট্য

সাধারণত জুলাই-আগস্ট থেকে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফুল ফুটতে থাকে। তবে এবার মে মাসেই ফুলের দেখা মিলেছে। ফুলে সেমাইয়ের মতো পুংকেশরগুচ্ছের আড়ালে পড়ে থাকে পাপড়ি, ওটার দেখাই মেলে না। কেশরগুচ্ছের মাঝখান থেকে উঁকি দেয় চিকন কাঠির মতো গর্ভকেশর। ডালের আগায় ফুল ফোটে। ফল চ্যাপটা গোলাকার, গাঢ় সবুজ, মসৃণ।

ছইলার জন্মস্থান

ছইলাগাছ তীব্র লবণাক্ততা সহ্য করতে পারলেও মধ্যম লবণাক্ত এলাকায় ভালো জন্মে, বিশেষ করে নদী ও খালের তীরে গভীর কর্দমাক্ত মাটিতে এ গাছ বেশি দেখা যায়।

মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক