বজ্রপাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় শিবরাম গ্রামে কৃষক ছাউনি
বজ্রপাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় কৃষক ছাউনি

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের শিবরাম গ্রামে বজ্রপাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় নির্মিত হয়েছে একটি ‘কৃষক ছাউনি’। চারদিকে ফাঁকা ফসলের মাঠ, সদ্য কাটা বোরো ধান। প্রখর রোদে একটি গোলঘরে বসে আছেন কয়েকজন যুবক। এই গোলঘরটির নামই ‘কৃষক ছাউনি’। কৃষি বিভাগ এটি নির্মাণ করেছে। ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়ে বজ্রপাত ছাড়াও রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাচ্ছেন এলাকার মানুষ।

ছয় বছর ধরে সুফল

ছয় বছর ধরে কৃষকেরা এই ছাউনির সুফল পেলেও এর সংখ্যা আর বাড়েনি। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম মিজানুর রহমান দাবি করেন, কৃষক ছাউনিটি নির্মাণের পর থেকে ওই এলাকায় বজ্রপাতে কেউ মারা যায়নি। মাঠে কর্মরত অবস্থায় আকাশে মেঘ দেখলেই কৃষকেরা ছাউনিতে আশ্রয় নিতে পারছেন।

বজ্রপাতে মৃত্যু ও আহত

গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ৫ জুন পর্যন্ত গাইবান্ধায় ১৩ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ১৫ থেকে ২০ জন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছাউনির বিবরণ

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে শিবরাম গ্রাম। গত শুক্রবার দুপুরে দেখা যায়, খড়ের তৈরি ঘরটির বেড়া নেই। আছে বসার জন্য পাকা বেঞ্চ। বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কয়েক যুবক। কিছুক্ষণ পর দুজন কৃষকও এসে বসলেন। ছাউনির নাম দেওয়া হয়েছে ‘কৃষকের ছাউনি’।

পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

এলাকাবাসী জানান, বজ্রপাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় ছাউনিটি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি বিভাগ। তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রেজা-ই-মাহমুদের পরিকল্পনায় এই উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সৈয়দ রেজা-ই-মাহমুদ মুঠোফোনে বলেন, পত্রিকা খুললেই দেখা যায় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যুর খবর। বিশেষত চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি। তাই কৃষকদের জন্য ভালো কিছু করার আগ্রহ থেকে এই কৃষক ছাউনি নির্মাণ করা হয়েছিল। রোদে কিংবা বৃষ্টির সময় কৃষকেরা ছাউনিতে বসে খেতেও পারেন। সে সময় কৃষক ছাউনি নির্মাণে প্রকল্প তৈরি করে কৃষি অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। তবে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

নির্মাণ ব্যয় ও উদ্বোধন

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২০ সালের মার্চ মাসে শিবরাম গ্রামের ফাঁকা জায়গায় এই কৃষকের ছাউনি নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৩৮ হাজার টাকা। একই বছরের ৫ এপ্রিল ঘরের উদ্বোধন করেন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি উপজেলার মোট ১৫টি ইউনিয়নে অন্তত ৫০টি কৃষক ছাউনি নির্মাণে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কৃষকদের মতামত

জানতে চাইলে শিবরাম গ্রামের কৃষক আল আমিন (৪০) বলেন, ‘আগে বৃষ্টির সময় আমরা মাঠে ভয় নিয়ে কাজ করেছি। আগে আকাশ ডাকলে কোথায় যাবার উপায় ছিল না। এখন আমরা ওই ঘরে আশ্রয় নিচ্ছি।’

একই গ্রামের আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান (৪৮) বলেন, ‘ঝড় ও প্রচণ্ড রোদের সময়ও আমরা এই ঘরে বিশ্রাম নিতে পারছি। আরাম করে দুপুরের খাবার খেতে পারছি।’

শিবরাম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল আলম বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ সারা দেশে নেওয়া উচিত।

ছাউনি আর বাড়েনি কেন

কৃষক ছাউনি আর বাড়েনি কেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক রোস্তম আলী মুঠোফোনে বলেন, বরাদ্দ না থাকায় কৃষক ছাউনির সংখ্যা বাড়ানো যায়নি।

কৃষক ছাউনি বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী মুঠোফোনে বলেন, ‘শিবরাম গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষক ছাউনি নির্মাণে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা করেছিলাম। এতে কৃষকেরা উপকৃত হয়েছেন। সে সময় উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে প্রায় ৫০টি কৃষক ছাউনি নির্মাণে সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। পরে অর্থাভাবে করা যায়নি।’