কৃষি ও খাদ্যে নকল এবং ভেজাল পণ্যের ব্যবহার খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেজাল পণ্য শুধু অমানবিকই নয়, বরং এটি একটি মারাত্মক আইনি অপরাধ। সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তা, গণমাধ্যম, প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, কৃষি প্রশাসন সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সবাইকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞদের মতামত
দৈনিক ইত্তেফাক, ডিএই ও সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আয়োজিত ভার্চুয়াল ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। যৌথ আয়োজনে ছিল দৈনিক ইত্তেফাক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড। মিডিয়া সহযোগিতা ছিল বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ)।
ড. মো. আব্দুর রহিম: ভেজাল প্রতিরোধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুর রহিম বলেন, দেশের উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পেস্টিসাইড অ্যাক্ট ও রুলস, উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন, সার ব্যবস্থাপনা বিধিমালা এবং জৈব কৃষি নীতিমালাসহ বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা কার্যকর রয়েছে। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট লিগ্যাল কাঠামোর মাধ্যমে কৃষি উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সিং কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে ভেজাল ও নকল কৃষি উপকরণের বিস্তার এবং অপরিকল্পিত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর ফলে মাটি, পানি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষির টেকসই উন্নয়নকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই এসব উপকরণের যৌক্তিক ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ এবং তদারকি জোরদার করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কৃষিকে আরো নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব করতে ভেজাল ও নকল কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করা হবে।
আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ: নকল ও ভেজাল ইনপুটে হুমকির মুখে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, বাজারে কৃষিপণ্যের সংকট দেখা দিলে নকল ও ভেজাল পণ্যের বিস্তার বৃদ্ধি পায়। বর্তমান প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে নকল পণ্য এমনভাবে তৈরি হচ্ছে যে খালি চোখে আসল ও নকলের মধ্যে পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষি উপকরণ বিক্রি হওয়ায় তদারকি কার্যক্রম আরো জটিল হয়েছে। বিদ্যমান আইনগুলো সময়োপযোগী না হওয়ায় নকল ও ভেজাল কৃষি উপকরণের বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে, যা কৃষি উৎপাদন ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। বাংলাদেশে ১৯৫০ সালে বালাইনাশক শিল্পের সূচনা হলেও ১৯৭১ সালের পর থেকে এ খাত নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সর্বশেষ বালাইনাশক (পেস্টিসাইড) অ্যাক্ট, ২০১৮ প্রণীত হলেও এর বিধিমালা এখনো হালনাগাদ হয়নি। ফলে বিপুল সংখ্যক পণ্য ও কোম্পানিকে কার্যকরভাবে তদারকি করা বিদ্যমান কাঠামোর জন্য চ্যালেঞ্জ। একটি স্বীকৃত কোম্পানির ক্ষেত্রে গবেষণা, উন্নয়ন, পরীক্ষণ এবং সরকারি অনুমোদন শেষে একটি কৃষি উপকরণ বাজারজাত করতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় এবং প্রায় ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। বিপরীতে নকল বা ভেজাল পণ্য প্রস্তুতকারীরা এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কম দামে অনিরাপদ পণ্য বাজারে ছাড়ে। এর ফলে কৃষক, ভোক্তা এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বালাইনাশকের ভেজালের হার প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব রয়েছে।
হেদায়েত উল্লাহ: স্বচ্ছতা ও অংশীদারত্বে গড়ে উঠুক টেকসই কৃষি ইকোসিস্টেম
সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেদায়েত উল্লাহ বলেন, নকল কৃষি উপকরণ বাজারের স্বচ্ছতা, কৃষকের আস্থা এবং সামগ্রিক কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত করে। এটি শুধু কৃষি উৎপাদনশীলতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, একইসঙ্গে বৈধ শিল্পের বিনিয়োগ পরিবেশ ও বিকাশকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। সিনজেনটা বাংলাদেশ সরকারের চলমান উদ্যোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করছে এবং বাজারে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সরকার, শিল্প খাত, ডিলার বা রিটেইলার নেটওয়ার্কসহ গণমাধ্যমের সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এরই মধ্যে সিনজেনটা এ বিষয়ে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা জোরদার করেছে, রিটেইলারসহ কৃষকদের প্রশিক্ষণ সম্প্রসারিত করেছে এবং কৃষককেন্দ্রিক বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করেছে, যা নকল ও ভেজাল পণ্য প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং নিরাপদ কৃষি চর্চার ওপর সিনজেনটা বাংলাদেশ বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে কারণ টেকসই কৃষি নিশ্চিত না হলে কৃষকের ভবিষ্যৎ এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়বে। নকল ও ভেজাল উপকরণের ব্যবহার শুধু ফসলের ক্ষতি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে মাটি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা কৃষকের জীবিকা ও আয়কে সরাসরি প্রভাবিত করে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কৃষকের বিনিয়োগের সঠিক প্রতিফলন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন কৃষক যখন মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার করেন, তখন তার উৎপাদনশীলতা বাড়ে, খরচের যথাযথ মূল্য ফিরে আসে এবং তার জীবিকা আরো স্থিতিশীল হয়। এ জায়গায় নকল পণ্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা, যা কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা ও আস্থাকে নষ্ট করে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), শিল্প খাত, ডিলার বা রিটেইলার এবং কৃষকদের সমন্বিত ও দায়িত্বশীল অংশীদারত্বের উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, কার্যকর বাজার তদারকি এবং শক্তিশালী নীতিমালার বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব। আমরা সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগ, নীতিগত সহায়তা এবং কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থাকে সাধুবাদ জানাই এবং এ ধরনের কার্যক্রম আরো জোরদার করার আহ্বান জানাই।
মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম: কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করলেই শক্ত হবে কৃষির ভিত্তি
সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালক (কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, নকল কৃষি উপকরণ শুধু একটি অবৈধ পণ্য নয়, এটি একজন কৃষকের পরিশ্রম, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নের ওপর সরাসরি আঘাত। যখন কৃষক প্রতারিত হন, তখন শুধু ফসলের ক্ষতিই হয় না; সবচেয়ে গভীর ক্ষতি হয় আস্থার, আর সেই আস্থাই টেকসই কৃষি ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। সিনজেনটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, দায়িত্বশীল ব্যবসা শুধু পণ্য বিপণনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর সঙ্গে জড়িত থাকে কৃষক, বাজার এবং বৃহত্তর সমাজের প্রতি সুস্পষ্ট জবাবদিহি। সে কারণেই আমরা স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা এবং শক্তিশালী অংশীদারত্বের মাধ্যমে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছি।
তাপস কুমার সাহা: রিটেইলার সক্ষমতা ও কৃষি পরামর্শ বিস্তারে কমবে ভেজালের ঝুঁকি
সাহা এগ্রো সার্ভিসেসের স্বত্বাধিকারী তাপস কুমার সাহা বলেন, কৃষক অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য না জেনেই কীটনাশক বা কৃষি উপকরণ কিনে ব্যবহার করেন। পণ্যের লেবেলে কী লেখা আছে, কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এসব বিষয় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অজানা থাকে। এ বাস্তবতায় রিটেইলারদের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রিটেইলারদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে যাতে তারা কৃষকদের সঠিক তথ্য ও পরামর্শ দিতে পারেন-কখন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে, কোন পণ্য কার্যকর এবং কোনটি এড়িয়ে চলা উচিত। তবে কৃষিতে নকল ও ভেজাল পণ্যের বিস্তার রোধে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কম অর্থদণ্ডের কারণে ভেজাল উৎপাদকরা সহজেই স্থান পরিবর্তন করে পুনরায় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। নিয়মিত অভিযান এবং কঠোর শাস্তির মাধ্যমে এ প্রবণতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম: কৃষি বিপণনে শৃঙ্খলা আনতে শক্তিশালী নজরদারি ও কাঠামো দরকার
খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, আমাদের দেশে যেমন সার, বীজ ও বালাইনাশকের ক্ষেত্রে ভেজাল ও নকল পণ্যের সমস্যা রয়েছে, তেমনি কৃষি সংশ্লিষ্ট 'ভেজাল পরামর্শ'ও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা কৃষি বিষয়ে প্রশিক্ষিত নন বা পেস্টিসাইড, ইনসেকটিসাইড কিংবা নেমাটিসাইড সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখেন না, তারাও কৃষককে পরামর্শ প্রদান করছেন। এ ধরনের ভুল বা বিভ্রান্তিকর পরামর্শ কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আর্থিক ক্ষতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেখা যায়, কৃষক সমস্যার সম্মুখীন হলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার শরণাপন্ন না হয়ে সরাসরি কীটনাশকের দোকানে যান এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ ক্রয় করেন। এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে যেমন মডেল ফার্মেসি বা আদর্শ ওষুধ বিপণন ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তেমনি কৃষি খাতেও একটি 'মডেল কৃষি বিপণন কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে কৃষক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সঠিক পরামর্শ ও মানসম্মত কৃষি উপকরণ পেতে পারেন। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে গবেষণালব্ধ তথ্য ও সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।
কাজী শফিকুল ইসলাম: বালাইনাশকের গুণগতমান নিশ্চিতে কার্যকর প্রয়োগ ও তদারকি প্রয়োজন
ডিএই-এর উপপরিচালক (বালাইনাশক ও মান নিয়ন্ত্রণ) কাজী শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে বালাইনাশক সাধারণত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত: কৃষিতে ব্যবহৃত (পিএইচপি), জনস্বাস্থ্যে ব্যবহৃত (পিএইচপি) এবং জৈব বালাইনাশক। কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও ইঁদুরনাশকের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যবহৃত মশার কয়েল, অ্যারোসল ও তরল স্প্রেও এ আওতার অন্তর্ভুক্ত। ভেজাল ও নকল বালাইনাশক প্রতিরোধকে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। খামারবাড়ির কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারে উপজেলা পর্যায় থেকে প্রেরিত নমুনাগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় এবং কোনো পণ্যে ভেজাল প্রমাণ হলে তা বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। নতুন বিধিমালায় প্রতিটি বালাইনাশকের প্যাকেটের ভেতরে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ একটি তথ্যপত্র (লিফলেট) সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সঠিক ব্যবহারে সহায়তা করবে। খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারদের জন্য ন্যূনতম প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা কৃষককে সঠিক তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করতে পারেন। একইসঙ্গে কীটনাশকের বোতলে উল্লেখিত পিএইচআই (ফসল তোলার পূর্ববর্তী নিরাপদ সময়) সম্পর্কে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, কারণ এটি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হয়।
মাসুদুর রহমান: বাজার শৃঙ্খলা ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় নকলমুক্ত কৃষির বিকল্প নেই
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)-এর উপমহাসচিব মাসুদুর রহমান বলেন, ব্যবসা ও বাজার ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে নকল ও ভেজাল কৃষি উপকরণের সমস্যা শুধু কৃষি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি বাজারের স্বচ্ছতা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। নকল ইনপুট বাজারে প্রবেশ করলে শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং দেশের বিনিয়োগ পরিবেশও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়ে। যেসব প্রতিষ্ঠান আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে এবং নিয়মিত কর প্রদান করে, তাদের জন্য এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এমন দায়িত্বশীল ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা একটি সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং নিয়মভিত্তিক বাজার ব্যবস্থার পক্ষে। একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক বাজার কাঠামো ছাড়া টেকসই ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। শুধু নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; এটি মোকাবিলায় প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ। এ লক্ষ্যে সরকারি সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষককে সুরক্ষা দেওয়া এবং বৈধ ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা।
তাহমিনা বেগম: আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও ভোক্তা সচেতনতায় কমবে প্রতারণা
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ) তাহমিনা বেগম বলেন, ভেজাল ও নকল পণ্য প্রতিরোধ শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় মোবাইলকোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একইভাবে মোড়কজাতকরণ বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত তথ্য পণ্যের মোড়কে উল্লেখ না থাকলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, যার জন্য অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড উভয়ই প্রযোজ্য। সার, বীজ ও বালাইনাশকের ক্ষেত্রে ওজনে কারচুপি, কম পরিমাণে সরবরাহ অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয় ভোক্তা অধিকার আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অপরাধের জন্য অর্থদণ্ড এবং কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, যা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পণ্যের বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করে ক্রেতাদের প্রতারিত করাও আইনের আওতায় অপরাধ। কোনো পণ্যের গুণমান সম্পর্কে অতিরঞ্জিত বা অসত্য দাবি করা কিংবা নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রেও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ভেজাল ও নকল কৃষি উপকরণ প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি নকল বীজ, সার বা কীটনাশক উৎপাদন বা বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত থাকে, সে বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে বাজার তদারকি কার্যক্রম আরো কার্যকর করা সম্ভব।
দেবাশিস চ্যাটার্জি: ভেজাল রোধে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ও বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি
বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (বিসিপিএ)-এর ব্যবস্থাপক দেবাশিস চ্যাটার্জি বলেন, বর্তমানে অনেক বালাইনাশক পণ্যের লেবেলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য (সিকিউরিটি কোড) অনুপস্থিত, যা নকল ও ভেজাল পণ্য শনাক্তকরণকে কঠিন করে তোলে। এ সমস্যা সমাধানে কিউআর কোড বা হলোগ্রাম সংযুক্ত করার বিধান রেখে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লেবেলিং প্রক্রিয়া শতভাগ নিশ্চিত করা এবং অটোমেশন সিস্টেম চালু করা গেলে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের জন্য পণ্যের সত্যতা যাচাই ও তদারকি কার্যক্রম অনেক সহজ ও কার্যকর হবে। এ লক্ষ্যে বিসিপিএ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মশালা আয়োজন করছে। পণ্যের গুণমান বজায় রাখতে একটি সুসংহত বার্ষিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। নিবন্ধন নবায়নের সময় প্রতি তিন বছর অন্তর এবং মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে মান যাচাই করা হয়। প্রতি বছর প্রায় ২,০০০ পণ্যের নবায়ন এবং ১,০০০-এর বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে মান সন্তোষজনক পাওয়া যায় না। এ ধরনের পণ্যের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী বাজার থেকে প্রত্যাহার বা জব্দ করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে জব্দকৃত ভেজাল পণ্য ধ্বংস বা নিষ্পত্তির পূর্ব পর্যন্ত নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য সুস্পষ্ট কাঠামোর অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
শামসুদ্দিন আহমেদ: ভেজাল রোধে সামাজিক আন্দোলন ও জাতীয় উদ্যোগ অপরিহার্য
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান প্রতিবেদক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমানে নকল ও ভেজাল কৃষি উপকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মহামারি রূপ ধারণ করেছে। এর ফলে কৃষক শুধু আর্থিকভাবেই নয়, স্বাস্থ্যগত ও মানসিক দিক থেকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। এ বাস্তবতায় ভেজাল সমস্যাকে একটি জাতীয় ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করা জরুরি। একইসঙ্গে এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া প্রয়োজন, যেখানে সরকার, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কৃষি প্রশাসন-সবাই সমন্বিতভাবে ভূমিকা পালন করবে। সমস্যার কার্যকর সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো পৃথক সেল গঠন করতে পারে, যেখানে অভিজ্ঞ পেশাজীবী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হবে। পাশাপাশি একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে কৃষিবিদ, গবেষক, কৃষক, বীজ ও বালাইনাশক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন আরো কার্যকর হবে। সঠিক আইন প্রয়োগ ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে নকল ও ভেজাল কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। কৃষিকে ভেজালমুক্ত রাখা মানেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সাহানোয়ার সাইদ শাহীন: গণমাধ্যমের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে
বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের (বিএজেএফ) সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন বলেন, আমরা মনে করি, ভেজাল প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএজেএফ বাংলাদেশের কৃষি খাতের উন্নয়ন ও এ খাতের সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। ভেজাল ও নকলমুক্ত কৃষি গড়তে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করছি, নীতি প্রণয়নে সহায়তা করছি। দি ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এগ্রিকালচারাল জার্নালিস্টসের (আইএফএজে) স্বীকৃত গিল্ড সদস্য হিসেবে বিএজেএফের মূল লক্ষ্য হলো কৃষি ও খাদ্য খাতের সংবাদ ও লেখনীর মাধ্যমে কৃষকের অধিকার রক্ষা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা। বিএজেএফ চলতি বছর ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। বছরব্যাপী এ উদযাপনের মূল লক্ষ্যই হলো নকল ও ভেজাল প্রতিরোধে আরো সোচ্চার ভূমিকা পালন করা। আমাদের দেড় শতাধিক সাংবাদিক সারা দেশের কৃষক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নকল-ভেজালের ক্ষতি ও প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি।



