বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান সংকট: যুদ্ধের প্রভাবে শ্রমবাজার হিমশীতল
বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের বাজার আগে থেকেই অস্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অর্থনীতিবিদেরা একে ‘হিমশীতল’ দশা হিসেবে বর্ণনা করছেন, যা শ্রমবাজারে ব্যাপক স্থবিরতা সৃষ্টি করছে।
শ্রমবাজারে স্থবিরতা ও অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ নিকোলাস ব্লুম স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যাঁদের হাতে এখন চাকরি আছে, তাঁরা দয়া করে তা ছাড়বেন না।’ কারণ, সামনের দিনগুলোয় নতুন কাজ পাওয়া বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অধ্যাপক ব্লুম বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনো সুপারহিরোর বরফ-শীতল ঝাপটার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০১৩ সালের পর (করোনা মহামারি বাদে) বর্তমানে নিয়োগের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মজার বিষয় হলো, মালিকেরা যেমন নতুন কর্মী নিচ্ছেন না, তেমনি পুরোনোদের ছাঁটাইও করছেন না। এই ‘কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই’ নীতির কারণে নতুন গ্র্যাজুয়েট বা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সুযোগ একেবারে কমে গেছে, যা শ্রমবাজারে একটি অদ্ভুত স্থবিরতা তৈরি করেছে।
জ্বালানি সংকট ও বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাব
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা শুরুর পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জনপ্রিয় চাকরির সাইট ইনডিড-এর অর্থনীতিবিদ কোরি স্টাহলে মনে করেন, এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। মূলত কোনো ভুল নিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো এই অস্থির সময়ে বড় আর্থিক ঝুঁকি নিতে চাইছে না, যা কর্মসংস্থান বাজারে আরও সংকোচন সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সংকটের প্রভাব
বৈশ্বিক এই অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের শ্রমবাজারেও অনুভূত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দেশে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা সরাসরি কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলে। বিদেশের বাজারে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া বা প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও যুদ্ধের কারণে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও রপ্তানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছে। ফলে বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের জন্য বিদেশের ও দেশের বাজারই এখন সংকুচিত হয়ে আসছে, যা ভবিষ্যত কর্মসংস্থানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে, অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে বর্তমান চাকরিধারীরা তাদের পদে স্থির থাকুন এবং নতুন চাকরিপ্রার্থীরা অতিরিক্ত যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করুন। বিশ্বজুড়ে এই হিমশীতল দশা কাটাতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে, যাতে শ্রমবাজার পুনরুজ্জীবিত হয় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।



