গতকাল সোমবার লেবাননের টায়ার উপকণ্ঠে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। এটি ছিল এমন একটি দিন, যা দেখিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে প্রজন্ম ধরে চলা মার্কিন বিদ্বেষ প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের জন্য কীভাবে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হুমকির মুখে
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক উপায়ে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। তাঁর সেই নাজুক প্রচেষ্টা হঠাৎই ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল গতকাল সোমবার সকালে। এর কারণ বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলীতে তেহরান–সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলার হুমকি এবং তার পাল্টায় ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এই আকস্মিক উত্তেজনায় ট্রাম্প নিজের প্রতিক্রিয়া চেপে রাখতে পারেননি।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে তিনি যে হতাশ, তা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি এ যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, এখন তা জুন মাসে গড়িয়েছে। অথচ যুদ্ধের শুরুতে তিনি দ্রুত ও নিশ্চিত বিজয়ের কথা বলেছিলেন। তাঁর সেই আশা এখন নিরাশায় গড়িয়েছে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করেছে বলে যে দাবি উঠেছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প সিএনবিসিকে বলেন, ‘আমি সত্যিই পরোয়া করি না। এতে আমার কিছুই যায় আসে না।’
ট্রাম্প আরও বলেন, এই আলোচনা খুবই একঘেয়ে হয়ে উঠেছে, তবে মুখে পরোয়া না করার কথা বললেও ট্রাম্প ঠিকই জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। তিনি সেদিনই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। ওই ফোনালাপ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং লেবাননে পরিকল্পিত সামরিক অভিযান নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অশালীন শব্দও ব্যবহার করেন।
ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ ও যুদ্ধবিরতি
ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ হয়তো ইরান–সংক্রান্ত তাঁর কূটনৈতিক উদ্যোগকে টিকিয়ে রেখেছে, তবে ইসরায়েল সম্ভবত হিজবুল্লাহর শক্তি দমন করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। এর ফলে লেবানন সংকট সব সময়ই উত্তপ্ত হয়ে ওঠার এবং তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাকে ব্যাহত করার ঝুঁকি তৈরি করবে।
ট্রাম্প জানান, তিনি হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাঁর ভাষায় ‘উচ্চপর্যায়ের’ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কথা বলেছেন। এরপর তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেন, উভয় পক্ষই (লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল) গুলি না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে নিয়ে আলোচনা ‘দ্রুতগতিতে’ এগিয়ে চলছে বলেও জানান।
পরে ওয়াশিংটনে লেবাননের দূতাবাস থেকে বলা হয়, বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর হামলা থেকে বিরত থাকছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল এক বিবৃতিতে জানায় যে তারা দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে। তবে একই সঙ্গে পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয় যে অন্তত আপাতত তারা বৈরুতে হামলা চালাবে না।
অনেক জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে নোঙর করে আছে। গত ৩০ মে ওমানের মুসান্দাম থেকে ড্রোন দিয়ে তোলা ছবি। ট্রাম্পের এই হস্তক্ষেপ হয়তো ইরান-সংক্রান্ত তাঁর কূটনৈতিক উদ্যোগকে টিকিয়ে রেখেছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে যাওয়ার আশা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর দ্রুত অবনতি হতে থাকা পরিস্থিতির প্রভাব আটকে দেওয়ার সম্ভাবনাও জড়িয়ে আছে।
ইরানের ওপর প্রভাব
গতকালের এই নাটকীয় পরিস্থিতি ইরানকে এটাও দেখিয়ে দিয়ে থাকতে পারে যে ট্রাম্প এখনো নেতানিয়াহুকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা রাখেন। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে যেকোনো চুক্তির আলোচনা টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, ইসরায়েল যেকোনো সময় এর বিরোধিতা করতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আজ (সোমবার) ছোট একটি সমস্যা তৈরি হয়েছিল, তবে আপনারা সম্ভবত আগেই লক্ষ করেছেন, আমি খুব দ্রুতই সেটি সামাল দিয়েছি।’ সেন্টার ফর মিডলইস্ট অ্যান্ড গ্লোবাল অর্ডারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আলী ফাতহোল্লাহ-নেজাদ সিএনএনকে বলেন, এই ফোনালাপটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বিদ্যমান ক্ষমতার সম্পর্কের ধরনকে তুলে ধরে।
তবে ইতিহাস ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কঠোর বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ট্রাম্পের এই কূটনৈতিক তৎপরতা হয়তো সাময়িক সমাধান মাত্র। ওই অঞ্চলে ইসরায়েল ও ইরানের স্বার্থের সংঘাত যেমন আবার দেখা দিতে পারে, তেমনি দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসও রয়ে গেছে, যে অবিশ্বাস অতীতে ট্রাম্পের বর্তমান উদ্যোগের চেয়েও বড় বড় মার্কিন শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। এই জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতাগুলো প্রেসিডেন্টের জন্য সংকট থেকে গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী উপায়ে বেরিয়ে আসার আশাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
লেবানন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের যুদ্ধক্ষেত্র
লেবানন কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে? দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান দেখলে এ প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশে মেলে। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সরু ভূখণ্ডের দেশ লেবানন, হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় এক হাজার মাইল উত্তর-পশ্চিমে এর অবস্থান। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান।
অর্ধ শতাব্দী ধরে লেবানন যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গেছে, দেশটি বারবার রাজনৈতিক পতন ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে। লেবানন বারবার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েল, ইরান, সিরিয়া ও বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর মধ্যকার ছায়া সংঘাতের ক্রসফায়ারে আটকে আছে।
ট্রাম্প প্রশাসন জোর দিয়ে বলছে, লেবাননে উত্তেজনা ইরানের সঙ্গে তাদের চলমান বিরোধ থেকে আলাদা বিষয় এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে দুই পক্ষের আলোচনার অগ্রগতিতে এর প্রভাব পড়া উচিত নয়। কিন্তু ইরান বিষয়টিকে সেভাবে দেখছে না।
লেবানন ইসরায়েলের উত্তরে অবস্থিত। এ কারণে ইসরায়েলের জন্য হুমকি তৈরি করতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তেহরান চায়, তাদের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) আর্থিক ও সামরিক সহায়তায় হিজবুল্লাহ লেবাননে একটি কার্যকর শক্তি হিসেবে টিকে থাকুক।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু হিজবুল্লাহর শিকড় লেবাননের অনেক গভীরে প্রোথিত এবং শিয়া মিলিশিয়া ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক হিজবুল্লাহ এখনো তেহরানের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। পাশাপাশি যুদ্ধের পর ইসরায়েলকে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আইআরজিসির যেকোনো প্রচেষ্টার সঙ্গে হিজবুল্লাহ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
অন্যদিকে, ইরানও ওয়াশিংটনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে এ যুদ্ধের সূচনা করেছিল। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ইরানের এমন দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।
ইসরায়েলের অবস্থান ও লেবাননের জটিলতা
ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন ও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। দেশটির দাবি, হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করতে হবে এবং এ কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব সব সময় তারা লেবানন সরকারের ওপর চাপায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দুর্বল লেবানন সরকারের পক্ষে ইসরায়েলের এই দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, ধর্মের ভিত্তিতে দেশটি একটি বিভক্ত রাষ্ট্র। সেখানে খ্রিষ্টান, শিয়া, সুন্নি মুসলিমসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে।
লেবাননের নেতারাও হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার পক্ষে। কিন্তু তাঁদের মতে, একটি ব্যাপক রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে এটি সম্ভব। আর এটা বাস্তবায়নে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হতে পারে। এই সময়ে ইসরায়েল সম্ভবত হিজবুল্লাহর শক্তি দমন করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। এর ফলে লেবানন সংকট সব সময়ই উত্তপ্ত হয়ে ওঠার এবং তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাকে ব্যাহত করার ঝুঁকি তৈরি করবে।
এটি সেই মিত্রদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের আরেকটি উদাহরণ, যারা ইরান যুদ্ধের সূচনা করেছিল। ইসরায়েল তার নিরাপত্তা রক্ষাকে একটি অবিরাম মিশন হিসেবে দেখে, যার মধ্যে সময়ে সময়ে যুদ্ধ জড়িত হওয়াও থাকতে পারে। অন্যদিকে, ট্রাম্প একটি চূড়ান্ত সমাধান চান এবং এ অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিতে চান।
ট্রাম্প প্রশাসন বোঝে যে লেবানন কীভাবে সেই লক্ষ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মধ্যে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে খুবই প্রাথমিক অগ্রগতি হয়েছিল, তবে ইতিমধ্যেই পরিস্থিতির পরিবর্তনে সেই অগ্রগতি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী সংকটের আশঙ্কা
এর ফলে অর্ধ শতাব্দী ধরে লেবানন যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গেছে, দেশটি বারবার রাজনৈতিক পতন ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে। লেবানন বারবার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েল, ইরান, সিরিয়া ও বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর মধ্যকার ছায়া সংঘাতের ক্রসফায়ারে আটকে আছে। সেই সঙ্গে দেশটি এখনো ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধ এবং ১৯৮২ সালের ইসরায়েলি আক্রমণের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার লড়াই করে যাচ্ছে। ইসরায়েলের আক্রমণ লেবাননকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। লেবানন এখনো এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কেন্দ্র হয়ে আছে, যা ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে কাগজে-কলমে একটি যুদ্ধবিরতি চলছে, যদিও যুদ্ধবিরতির মধ্যে উভয় পক্ষই একে অপরের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। গত সপ্তাহান্তে মার্কিন বাহিনী ইরানের রাডার ও ড্রোনে হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে ইরানি বাহিনীও একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানার দাবি করেছে। তাই লেবানন পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তোলার আগে থেকেই এই সংঘাত যথেষ্ট নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্প হয়তো গতকালের মতো পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। তবে তিনি নতুন করে এই শিক্ষাই পেলেন যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের যেকোনো উদ্যোগ শুরু করা যতটা সহজ, তা থেকে বেরিয়ে আসা ঠিক ততটাই অসম্ভব।



