মানবসম্পদ উন্নয়নের মূলে: জাতির ভাগ্য নির্ধারণে মানুষের বিকাশ কেন অপরিহার্য?
মানবসম্পদ উন্নয়ন: জাতির ভাগ্যের চাবিকাঠি

মানবসম্পদ: একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ ও উন্নয়নের ভিত্তি

একটি দেশ বা ভূখণ্ডের প্রকৃত সম্পদ তার মাটি, নদী বা খনিজ নয়, বরং তার মানুষ। কারণ মাটি নিঃশব্দ, খনিজ নিষ্ক্রিয়; কিন্তু মানুষই একমাত্র সত্তা, যা চিন্তা করে, সৃজন করে, ভুল করে এবং পুনরায় সংশোধন করে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারে। অতএব, যে জাতি তার মানুষকে গড়ে তুলতে পারে, সেই জাতিই ইতিহাসের প্রবাহে সুস্পষ্ট ছাপ রাখতে সক্ষম হয়।

মানবসম্পদের গুরুত্ব ও বৈশ্বিক উদাহরণ

ইহা সর্বজনবিদিত যে, বহু রাষ্ট্র প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে দারিদ্র্যগ্রস্ত হলেও মানবসম্পদের উৎকর্ষ দ্বারা বিশ্বে মর্যাদার আসন লাভ করেছে। অপরদিকে, বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যে সকল দেশ মানুষের বিকাশে অবহেলা করেছে, তারা উন্নয়নের পথে বারংবার ব্যর্থ হয়েছে। মানবসম্পদ কোনো আকস্মিক সৃষ্ট বস্তু নয়—ইহা এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিবিড় পরিচর্যা ও সুসংহত ব্যবস্থাপনার ফল।

একটি শিশু জন্মগ্রহণ করার পর থেকেই তার শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, উন্নত বিশ্ব সেই দায়ভার যথার্থভাবে গ্রহণ করেছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় নীতি—সকলই যেন এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা, যার লক্ষ্য একটিই: একটি সুগঠিত, সুশৃঙ্খল ও সৃজনশীল নাগরিক গড়ে তোলা। কারণ, আজকের শিশুই আগামীর রাষ্ট্রনায়ক, চিন্তাবিদ, নীতিনির্ধারক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মানবসম্পদ গঠনের স্তম্ভ ও চ্যালেঞ্জ

একটি শিশুর জন্মের পর থেকেই তার দেহ, মন, বুদ্ধি ও নৈতিক বোধ—এই চারটি স্তম্ভের উপর সমান গুরুত্ব আরোপ করতে হয়। যদি কোনো একটি স্তম্ভ দুর্বল হয়, তাহলে সমগ্র ব্যক্তিত্বই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এইখানেই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব অনস্বীকার্য। বস্তুত, একটি দেশ একখানি অনাবাদি জমির ন্যায়। সেই জমিকে কর্ষণ করতে হয়, বীজতলা প্রস্তুত করতে হয়, উপযুক্ত বীজ নির্বাচন করে যথাসময়ে বপন করতে হয়। তারপর প্রয়োজন নিয়মিত সেচ, সার প্রয়োগ, আগাছা দমন ও সযত্ন পরিচর্যা। এই প্রতিটি ধাপ যদি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়, তবেই ফলন হবে সমৃদ্ধ।

মানবসম্পদের ক্ষেত্রেও ইহাই সত্য। একটি শিশুর জন্ম থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন—প্রতিটি স্তরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও যত্ন অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তৃতীয় বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে এই মৌলিক সত্য উপেক্ষিত। শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই মানহীন, স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল, নৈতিক শিক্ষার অভাব প্রকট। ফলে মানবজমিনে আগাছার বিস্তার ঘটে, সুশস্যের চারা গজালেও তা টিকিয়ে থাকতে পারে না। কিছু প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হলেও সামগ্রিক জাতিগত উৎকর্ষ অর্জিত হয় না। এই কারণেই বহু দেশ স্বাধীনতার বহু দশক পরও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।

উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি: নীতি ও পরিকল্পনা

অনেকে এই ব্যর্থতার কারণ হিসাবে জাতিগত বৈশিষ্ট্য বা তথাকথিত ‘জেনেটিক সীমাবদ্ধতা’র কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু এই যুক্তি আংশিক ও বিভ্রান্তিকর। একই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্গত হয়েও মিয়ানমার উন্নয়নের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে, যেখানে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা সিংগাপুর অগ্রসর হয়েছে বহুগুণে। ইহা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি জিনগত নয় বরং নীতি, পরিকল্পনা ও শাসনব্যবস্থার গুণমান।

অতএব, একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার পরিকল্পনাকারী ও নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা দ্বারা। সুদূরপ্রসারী চিন্তা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও অবিচল রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে মানবসম্পদকে সোনালি শস্যে পরিণত করা সম্ভব। পৃথিবীর বহু রাষ্ট্র আছে, যাদের ভূমি উর্বর নয়, খনিজ সম্পদ সীমিত, তথাপি তারা উন্নয়নের শীর্ষে আরোহণ করেছে কেবল মানবসম্পদের উৎকর্ষের বলেই। জাপান এই সত্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সমানভাবে জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ফিনল্যান্ড—এই সকল রাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, মানুষের মান উন্নত হলে জাতির মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নীত হয়ে থাকে।

উপসংহার: মানবজমিনের আবাদ ও উন্নয়নের পথ

এই প্রসঙ্গে রামপ্রসাদের একটি প্রখ্যাত গান রয়েছে—‘এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা’। এই পঙক্তি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও উন্নয়ন অর্থনীতিরও এক গভীর উপমা। মানবজমিনকে পতিত রেখে উন্নয়ন সাধন অসম্ভব ব্যাপার। তৃতীয় বিশ্বের দুঃখ সেইখানেই। মানবসম্পদের উন্নয়ন ছাড়া কোনো জাতিই টেকসই উন্নতি অর্জন করতে পারে না, এবং এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়।