বিকেএমইএর জোরালো দাবি: শ্রম অধ্যাদেশ সংশোধন করে আইন পাস করুন
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) শ্রম অধ্যাদেশের কয়েকটি অস্পষ্টতা দূর করে আইন পাসের জরুরি দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি শ্রমিকের সংজ্ঞা পরিবর্তন, চাকরির অবসায়নে ক্ষতিপূরণ, যৌথ দর-কষাকষির প্রতিনিধি নির্বাচন এবং ভবিষ্য তহবিলে দ্বৈতনীতি দূর করার জন্য সংশোধন চেয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএর নেতাদের বক্তব্য
রোববার ঢাকার বাংলামোটর এলাকায় বিকেএমইএর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি উত্থাপন করা হয়। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। এ সময় সহসভাপতি অমল পোদ্দার ও মো. রাশেদ উপস্থিত ছিলেন।
বিকেএমইএর নেতারা বলেছেন, তৈরি পোশাকশিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত শ্রম আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তারা দাবি করেছেন, বিদ্যমান শ্রম আইনের সংশোধন ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) সভায় ঐকমত্য হয়েছিল, কিন্তু পরে অধ্যাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় পরিবর্তন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
শ্রম অধ্যাদেশের বর্তমান অবস্থা ও সংশোধনের প্রস্তাব
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গত নভেম্বরে শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। এতে শ্রমিকের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা, মহিলা শব্দের পরিবর্তে নারী শব্দ প্রতিস্থাপন, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের বিধান, মজুরি বোর্ড গঠন, ভবিষ্য তহবিল বাধ্যতামূলক করা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১২০ দিন এবং বার্ষিক উৎসব ছুটি ১৩ দিন করার মতো পরিবর্তন আনা হয়।
বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে ১১৭টি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে শ্রম অধ্যাদেশও রয়েছে।
বিকেএমইএর চারটি মূল দাবি
প্রথমত, শ্রমিকের সংজ্ঞা সংশোধন: মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রম অধ্যাদেশে শ্রমিকের সংজ্ঞায় কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু অধ্যাদেশের আরেকটি ধারায় বলা হয়েছে তারা শ্রমিক হিসেবে গণ্য হবেন না। এতে কর্মক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হবে, তাই শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে কর্মচারী বা কর্মকর্তা শব্দ বাদ দেওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, ক্ষতিপূরণের অস্পষ্টতা দূরীকরণ: তিনি উল্লেখ করেন, শ্রমিক নিজে চাকরি থেকে ইস্তফা দিলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অধ্যাদেশে অস্পষ্টতা রয়েছে। টিসিসির সভায় ঐকমত্য হয়েছিল যে শ্রমিকের চাকরির বয়স ৩ থেকে ৫ বছর হলে ৭ দিনের মজুরি, ৫ থেকে ১০ বছর হলে ১৫ দিন এবং ১০ বছরের বেশি হলে ৩০ দিনের মজুরি দেওয়া হবে। কিন্তু অধ্যাদেশে ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সংশোধন করা দরকার।
তৃতীয়ত, যৌথ দর-কষাকষি প্রতিনিধি নির্বাচন: টিসিসির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কোনো কারখানায় একটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকলেও নির্বাচনের মাধ্যমে যৌথ দর-কষাকষি প্রতিনিধি বা সিবিএ নির্বাচিত হতে হবে, যেখানে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট প্রয়োজন। তবে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, একটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে সেটিই সিবিএ হিসেবে গণ্য হবে। হাতেম বলেন, এতে শিল্পকারখানায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, কারণ ২০-২৫ জনের কমিটি নির্বাচন ছাড়া পুরো প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।
চতুর্থত, ভবিষ্য তহবিলে দ্বৈতনীতি দূরীকরণ: টিসিসির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কোনো প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের জন্য পেনশন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রগতি স্কিম চালু করলে আলাদা করে ভবিষ্য তহবিল করতে হবে না। কিন্তু অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা আবেদন করলে ভবিষ্য তহবিল করতে হবে। হাতেম মন্তব্য করেন, একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দুই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ।
বিকেএমইএর নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, তারা নতুন কিছু চাইছেন না, বরং টিসিসির বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শ্রম অধ্যাদেশ সংশোধন করে সেটিকে আইন আকারে পাস করার অনুরোধ করছেন। তাদের মতে, এটি তৈরি পোশাকশিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



