মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করতে মন্ত্রীর সফর, ৮ এপ্রিল আলোচনা
প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করা হলেও তেমন কোনও সাড়া মেলেনি। মালয়েশিয়ার শর্ত এবং নানা সংকটে ঝুলে আছে শ্রমবাজারের ভাগ্য। চলতি মাসেই এ সংকট নিরসনে মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৮ এপ্রিল তাদের সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
শ্রমবাজার বন্ধের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। তখন প্রায় ১৮ হাজার কর্মী সব কিছু ঠিক থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে যেতে পারেননি। এতে করে এসব কর্মীর জমা দেওয়া প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে। তবে সরকার ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো অর্থ ফেরতের দাবি করলেও অনেক কর্মী অভিযোগ করেছেন, তারা সম্পূর্ণ টাকা পাননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আটকে পড়া কর্মীদের পুনরায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এসব কর্মীদের প্রথম ফ্লাইট মালয়েশিয়ায় গেলেও প্রক্রিয়াটি এখনও ধীরগতির। বর্তমানে ৭ হাজার ৮৭৩ জন কর্মীকে সে দেশে নির্মাণ খাতে নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৬ নভেম্বর থেকে এ বছরের ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৮৮১ জন কর্মী ভিসা প্রাপ্তির পর বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স পেয়েছেন।
দীর্ঘদিনের সংকট ও সিন্ডিকেট সমস্যা
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। গত ১৬ বছরে তিন দফায় এ বাজার বন্ধ হয়েছে এবং প্রতিবারই শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ উঠেছে। এরপর চক্রের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ ওঠে।
- ২০০৯ সালে প্রথম বন্ধ: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রথম বন্ধ হয় ২০০৯ সালে। এরপর ২০১৬ সালে পুনরায় চালু হয়। তখন বাংলাদেশের ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি চক্র গড়েছিল।
- ২০১৮ সালে আবার বন্ধ: দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ২০১৮ সালে আবার বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের সমঝোতার ভিত্তিতে ২০২২ সালে বাজারটি পুনরায় খোলা হয়। তবে আবারও চক্র গঠন হয়।
- ২০২৪ সালের মার্চে স্থগিত: ২০২৪ সালের মার্চে মালয়েশিয়া জানায়, দেশটি আপাতত আর শ্রমিক নেবে না এবং ওই বছরের ৩১ মে পর্যন্ত কর্মীরা সেদেশে প্রবেশ করতে পারবে। ২০২৪ সালের মার্চে মালয়েশিয়া আবারও কর্মী নেওয়া স্থগিত করে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ করেছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে প্রায় ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলা বর্তমানে চলমান আছে।
পূর্ববর্তী উদ্যোগ ও অগ্রগতির অভাব
বাজারটি চালু করতে গত বছরের ১৩ থেকে ১৬ মে অন্তবর্তী সরকারের সাবেক প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী মালয়েশিয়া সফর করেন। সফরকালে তারা দেশটির স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সভায় অংশ নেন। সভা শেষে উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এক ভিডিও বার্তায় জানান, ‘কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে মালয়েশিয়া।’
এই সফর শেষে ওই বছরের ২১ ও ২২ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নিরাপদ অভিবাসন ও কর্মসংস্থান সম্পর্কিত তৃতীয় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা। যেখানে মালয়েশিয়া সরকারের ১৪ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে একাধিক বৈঠক হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তীতে মালয়েশিয়া ১০টি শর্ত আরোপ করলে বাংলাদেশ তিনটি শর্ত বাতিলের অনুরোধ জানায়। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সাড়া দেয়নি মালয়েশিয়া সরকার।
আগামী সফর ও আশার আলো
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে অমীমাংসিত কিছু বিষয়ে আলোচনা করতে আগামী ৮ এপ্রিল মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা আছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র এবং মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও বেশ কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তারা। পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এখনো বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ সূচি চূড়ান্ত হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে স্থবির রয়েছে এবং তা সচল করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারের দাবি
এদিকে গত রবিবার (২৯ মার্চ) সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজারের দাবিতে জনশক্তি রফতানিকারকদের একাংশ মানববন্ধন করেছে। তারা দাবি জানিয়েছেন, সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে কোনও সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রীর সফরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা হয়তো দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে।



