শ্রম অধ্যাদেশ (২০২৫) দ্রুত আইনে পরিণত করার জোরালো দাবি
শ্রমিক অধিকার ও শ্রম খাতের সংস্কারের জন্য প্রণীত শ্রম অধ্যাদেশ (২০২৫) দ্রুত আইনে পরিণত করে তা বাস্তবায়নের জরুরি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি ও সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তাসলিমা আখতার। আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে তিনি এই দাবি তুলে ধরেন।
মানববন্ধনের মূল উদ্দেশ্য
‘জাতীয় সংসদের প্রতি আহ্বান, শ্রমিক অধিকার ও শ্রম খাতের সুরক্ষা–সংস্কারে শ্রম অধ্যাদেশ (২০২৫) আইনে পরিণত করো’ শীর্ষক এই মানববন্ধনের আয়োজন করে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (বাজাফে–১২)। তাসলিমা আখতার তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, শ্রমিক–মালিক ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি এই অধ্যাদেশটি সংসদে আইনে রূপান্তরিত হওয়া উচিত এবং এই দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপর বর্তায়।
তাসলিমা আখতারের বক্তব্য
সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, ‘আমরা আশা করি, এই নির্বাচিত সরকার এবং যাঁরা সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাঁরা যদি জনগণের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হন, তাঁরা যদি জনগণের অভ্যুত্থানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে তাঁরা অবশ্যই এই আইন পাস করবেন।’ তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সংসদ একটি ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানের পটভূমিতে গঠিত হয়েছে, যেখানে ছাত্র, পেশাজীবী, নারী ও শ্রমিকেরা প্রাণ দিয়েছেন। এই পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়েই সরকার নির্বাচিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের মাধ্যমে যে শ্রম অধ্যাদেশ হয়েছে, তা আইনে পরিণত করতে হবে। তিনি জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে শ্রম অধ্যাদেশ একটি, এবং সংসদ চলাকালে ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে পাস না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।
অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী
এই অধ্যাদেশে নিম্নলিখিত সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তন করা হয়েছে:
- শ্রমিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিতকরণ
- ট্রেড ইউনিয়ন করার শর্ত শিথিলকরণ
- উৎসব ও মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি
- তিন বছর পরপর মজুরি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু
- যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা সংযোজন
মোট ১২৫টি ধারা সংশোধন করা হয়েছে। তাসলিমা আখতার বলেন, এই শ্রম অধ্যাদেশ শুধু শ্রমিকদের জন্য নয়, শ্রম খাত ও উৎপাদনশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যান্য বক্তাদের মতামত
ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক আলীফ দেওয়ান বলেন, ২০২৫ সালের শ্রম আইন সংশোধন ২০২৬ সালের সংসদে বাস্তবায়ন করা উচিত। তিনি দেশে শ্রমিকদের জন্য একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন, তাঁরা রিকশা চালানো বা হকারি করার মতো পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন। নতুন সরকার যেন বন্ধ শিল্পকারখানা চালু ও নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেয়।
নারী সংহতির সাধারণ সম্পাদক অপরাজিতা দেব বলেন, ‘একটা দেশ গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় কতটা এগিয়ে গেল, তা নির্ভর করছে ওই দেশের শ্রমিক, নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী কতটা তাদের অধিকার পেল, তার ওপর।’ তিনি মনে করেন, সরকার যদি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে জনগণ ও শ্রমিকের জন্য মানসম্পন্ন পরিবেশ, যথাযথ মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
বহুমুখী শ্রমজীবী সমিতির সভাপতি বাচ্চু ভূঁইয়া বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের পর শ্রম কমিশন গঠিত হয়েছিল এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতবিনিময় সভায় দেওয়া প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পৌঁছেছে। তিনি সরকারের কাছে তা বাস্তবায়নের দাবি জানান।
অন্যান্য অংশগ্রহণকারী
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন হাতিরঝিল সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান শাহাদাত হাওলাদার, কার ইউনিয়ন শ্রমিক সংহতির সংগঠক শহীদসহ অন্য শ্রমিকনেতারা। এই আয়োজনটি শ্রমিক অধিকার ও শ্রম খাত সংস্কারের জন্য একটি জোরালো পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



