শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস ছুটির আগেই পরিশোধের কঠোর নির্দেশ শ্রমমন্ত্রীর
শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-বোনাস ছুটির আগেই পরিশোধের নির্দেশ

শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি না করার কঠোর নির্দেশ

দেশের সকল শিল্প কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন এবং ঈদ বোনাস ছুটির আগেই পরিশোধ করার জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনও অবস্থাতেই শ্রমিকদের প্রাপ্য অর্থ নিয়ে যেন কোনও ধরনের জটিলতা বা বিলম্ব না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

উচ্চপর্যায়ের সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

শুক্রবার, ১৪ মার্চ তারিখে ঢাকার বেইলি রোডে অবস্থিত মন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের অফিস কক্ষে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল তৈরি পোশাক (আরএমজি) এবং নন-আরএমজি খাতে শ্রম অসন্তোষ নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করা। সভায় মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, বকেয়া পরিশোধে যদি কোনও কারখানা গড়িমসি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার তালিকা প্রস্তুত

সভায় মন্ত্রী আরও জানান, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি কারখানার একটি বিস্তারিত তালিকা সংসদীয় এলাকা ভিত্তিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই তালিকা সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের কাছে পাঠানো হবে, যাতে তারা সরাসরি কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করতে পারেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে শ্রমিকদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্প শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানে গড়িমসির সমালোচনা

শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কিছু ব্যাংকের ঋণ প্রদানে গড়িমসির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি বিশেষভাবে ইউসিবিএল, ট্রাস্ট ব্যাংক এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের নাম উল্লেখ করে বলেন, এই ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে বিলম্ব করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই ব্যাংকগুলোর সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কারখানাগুলো শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে সক্ষম হয়।

শ্রমিক নেতাদের ভূমিকা নিয়ে সতর্কতা

মন্ত্রী আরও বলেন, কিছু শ্রমিক নেতা অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি করে শিল্প খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। এই বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং প্রশাসনকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি, পলাতক মালিক এবং তাদের প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, এই কারখানাগুলোতে যেন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার বক্তব্য

সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিন বলেন, শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে কঠোর নজরদারি বজায় রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকার গঠনের পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

কারখানাগুলোর বেতন-বোনাস পরিশোধের হালনাগাদ তথ্য

সভায় বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ঢাকা এবং চট্টগ্রামে চালু থাকা মোট ২,১২৭টি কারখানার মধ্যে ১,৯৬৪টি কারখানা (৯২.৩৪ শতাংশ) ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করেছে। অন্যদিকে, ঈদের বোনাস দিয়েছে ১,৫৩৫টি কারখানা (৭২.১৭ শতাংশ)। তিনি আরও বলেন, মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ বাধ্যতামূলক না হলেও যেসব কারখানার আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তারা তা পরিশোধ করবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, দেশের মোট ৮৩৪টি কারখানার মধ্যে ৫১২টি কারখানা ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করেছে এবং ৬০৪টি কারখানা ঈদের বোনাস দিয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অধিকাংশ কারখানা বেতন-বোনাস দেওয়ায় বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হবে না।

আপদকালীন তহবিল গঠনের প্রস্তাব

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, একটি আপদকালীন তহবিল গঠন করা গেলে সেই অর্থ দিয়ে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস সংক্রান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে। এই তহবিলের মাধ্যমে জরুরি অবস্থায় শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।

সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ

এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন, ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য মো. তমিজ উদ্দিন, গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মনজুরুল করিম রনি, গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম এবং গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন। এছাড়াও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সভায় অংশগ্রহণ করেন এবং শ্রমিকদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে তাদের মতামত ও পরামর্শ প্রদান করেন।