পেশাজীবী নারীদের কর্মে ফেরাতে ব্র্যাকের 'ব্রিজ রিটার্নশিপ' কর্মসূচির সাফল্য
রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। এই সভায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক ও মাতৃত্বকালীন দায়িত্বের কারণে প্রায় ৭৫ শতাংশ পেশাজীবী নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। এছাড়াও, বিরূপ কর্মপরিবেশ, উচ্চশিক্ষার চাপ এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও নারীদের পেশাজীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তবে, বিশ্বব্যাপী গবেষণায় একটি আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে: কর্মবিরতিতে যাওয়া নারীদের মধ্যে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশই আবার কাজে ফিরতে আগ্রহী।
ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচির উদ্ভব ও কার্যক্রম
চাকরি থেকে বিরতি নেওয়া নারীদের আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে ব্র্যাক 'ব্রিজ রিটার্নশিপ' নামে একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করেছে। গত বছর শুরু হওয়া এই উদ্যোগের অধীনে, বিরতি নেওয়া নারীরা ব্র্যাকের বিভিন্ন প্রকল্পে ছয় মাসের জন্য কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এই কাজের পাশাপাশি, তাঁদের দক্ষতা উন্নয়ন, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং এবং পেশাগত উন্নয়নের জন্য নানা ধরনের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
ব্র্যাকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বছর এই কর্মসূচিতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি নারী আবেদন করেছিলেন। কয়েক ধাপের বাছাই প্রক্রিয়া শেষে মোট ২৪ জন নারীকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। গত বছর এই সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র ১৫ জন নারী, যা এবারের অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
কারণ ও প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতকরণ
ব্র্যাকের গবেষণায় আবেদনকারী নারীদের কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়ার মূল কারণগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তথ্য অনুসারে, ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী পারিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্য এবং ৩৬ শতাংশ নারী মাতৃত্বকালীন সময়ের কারণে চাকরি ছেড়েছেন। এছাড়া, বিরূপ কর্মপরিবেশের কারণে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সামাজিক চাপের কারণে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ নারী চাকরি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
অন্যদিকে, কাজে ফেরার ক্ষেত্রে নারীদের প্রধান অনুপ্রেরণাগুলোও গবেষণায় উঠে এসেছে। ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ নারী অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এবং ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ নারী পরিবারে অবদান রাখার উদ্দেশ্যে আবার কাজে যোগ দিতে চান। তবে, সবচেয়ে বেশি ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নারীর মূল উদ্দেশ্য হলো পেশাগত জীবনে উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করা।
বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর বলেন, 'আমরা প্রায়ই স্কুল ড্রপআউটের কথা বলি, কিন্তু ক্যারিয়ার ড্রপআউটও একটি বাস্তব সমস্যা। এটি বিশেষভাবে নারীদের প্রভাবিত করে। ক্যারিয়ার ড্রপআউটের একটি ব্যবহারিক সমাধান তৈরি করার চিন্তা থেকেই ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘ বিরতির পর নারীরা যখন চাকরির জন্য আবেদন করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সাক্ষাৎকারে ডাকা হয় না। এমনকি যাঁদের ডাকা হয়, তাঁদের প্রতি অনেক সময় নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়, যা তাঁদের মনোবল ভেঙে দেয়।
এ বছর নির্বাচিত ২৪ জনের মধ্যে একজন জাহরুন জান্নাত। চার বছর চাকরির পর তিনি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বিরতি নেন। দুই বছর পর কাজে ফেরার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। জাহরুন বলেন, 'বাচ্চার বয়স এক বছর হওয়ার পর থেকে আমি চাকরির চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু কোথাও সাড়া পাচ্ছিলাম না। এক জায়গায় সাক্ষাৎকারে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি বাচ্চা নিয়ে কীভাবে সামাল দেবেন? ব্র্যাকের এই উদ্যোগটি আমার জন্য একটি নতুন শুরু হিসেবে কাজ করেছে।'
মৌটুসী কবীর আরও জানান, '২৪ জন নারী সরাসরি ব্র্যাকের ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া, যাঁরা অত্যন্ত দক্ষ কিন্তু নির্বাচিত হননি, এমন ১২০ জন নারীর তথ্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করা হবে। যাতে প্রয়োজনে তারা এই নারীদের বিবেচনা করতে পারে।' তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায়, এই নারীরা যাতে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে তাঁদের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
আলোচনা ও সমাপ্তি
অনুষ্ঠানে একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ২০২৫ সালের ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচি থেকে ব্র্যাকে যোগ দেওয়া এলিজাবেথ মারান্ডী ও ফারাহ মাহবুব। জেন্ডার ইকুয়ালিটি কোয়ালিশনের কমিউনিকেশন ম্যানেজার সেমন্তী মঞ্জরীর সঞ্চালনায় এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। সভার শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মৌটুসী কবীর এবং ব্র্যাকের এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার নাজিবুল ইসলাম।
এই উদ্যোগটি নারীদের কর্মক্ষেত্রে পুনরায় একীভূত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্র্যাকের এই কর্মসূচি শুধু কর্মসংস্থানই নয়, বরং নারীদের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সাহায্য করছে।
