‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে এখনো ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছে, যা তাদের জীবনের জন্য চরম হুমকি। বিভাগীয় পর্যায়ে শিশুশ্রমের হার সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে।
বিভাগ শীর্ষে চট্টগ্রাম, জেলা শীর্ষে কুড়িগ্রাম
উপস্থাপনায় বলা হয়, চট্টগ্রাম বিভাগে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর পরেই ঢাকা বিভাগে ৩ লাখ ৪০ হাজার, রাজশাহীতে ২ লাখ ৪০ হাজার, রংপুরে ২ লাখ ২০ হাজার, সিলেটে ১ লাখ ৪০ হাজার, খুলনায় ১ লাখ ৩০ হাজার, ময়মনসিংহে ৯০ হাজার এবং বরিশালে ৭০ হাজার শিশু শ্রমিক রয়েছে। জেলা হিসেবে কুড়িগ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট
শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ছেলের সংখ্যা ১৩ লাখ ৭০ হাজার এবং মেয়ের সংখ্যা ৪ লাখ। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী তা অর্জিত হয়নি।
তিনটি খাতে শিশু শ্রমিক বেশি
বাংলাদেশে শিশুরা প্রধানত শিল্প, সেবা ও কৃষি খাতে কাজ করছে। শিল্প খাতে সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৯০ হাজার, সেবা খাতে (গৃহকর্মী, হোটেল কর্মী, ফুড ডেলিভারি, পরিবহন, কুরিয়ার সার্ভিস, পরিচ্ছন্নতাকর্মী) ৫ লাখ ৬০ হাজার এবং কৃষি খাতে ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু নিয়োজিত। সরকার ৪৩টি কাজকে শিশুদের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেমন অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, বাস-ট্রাকে সহকারী, ব্যাটারি রিচার্জিং, ইট ভাঙা, ইলেকট্রিক মেশিন ওয়ার্ক, প্লাস্টিক পণ্য তৈরি, ভাটা, ওয়েল্ডিং, জাহাজভাঙা শিল্প ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনা।
আইন ও শাস্তির বিধান
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (২০২৬ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী কাজে যোগদানের সর্বনিম্ন বয়স ১৪ বছর। আইন অমান্য করে কোনো শিশু বা কিশোরকে কাজে নিয়োগ দিলে মালিককে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিভাবক যদি শিশুকে কাজে দেওয়ার জন্য অবৈধ চুক্তি করেন, তবে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
চ্যালেঞ্জ
বক্তারা শিশুশ্রমের মূল কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, আইন ও নীতিমালার দুর্বল বাস্তবায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন ও নগরায়ণের চাপ এবং সচেতনতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেন।
শিশুশ্রম নির্মূলে নেওয়া পদক্ষেপ
জাতীয় নীতিগত কাঠামো গঠনের পাশাপাশি আটটি খাতকে শিশুশ্রমমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আইএলওর কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২ অনুসমর্থন করা হয়েছে। ৪৩ ধরনের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের অনানুষ্ঠানিক তৈরি পোশাক খাত থেকে শিশুশ্রম নির্মূলে খাতভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য কেরানীগঞ্জকে দেশের প্রথম খাতভিত্তিক শিশুশ্রমমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা। ‘ঠাকুরগাঁও মডেল’ বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং সফল পাইলট প্রকল্পগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
শিশুশ্রম নির্মূলে সুপারিশ
২০৩০ সাল পর্যন্ত শিশুশ্রম–সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিশুশ্রম ইউনিটের অধীন নির্দিষ্ট জনবল নিয়োগ, জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় শিশুশ্রম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সরকার ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা, শিশুশ্রমবিরোধী জাতীয় প্রচার চালানো, শ্রম আইন বাস্তবায়ন, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকা সম্প্রসারণ, দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু, শিশুদের পুনর্বাসন এবং জলবায়ু সহনশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলের সঙ্গে শিশুশ্রম নির্মূল কার্যক্রমকে সমন্বিত করার সুপারিশ করা হয়।
শিশুশ্রম নিজের ঘর থেকে বন্ধ করতে হবে
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘শুধু সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশ থেকে শিশুশ্রম নির্মূল করতে হবে। আর শিশুশ্রম নির্মূলের কাজ শুরু হতে হবে নিজের ঘর থেকে। বস্তি এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও কাজ করতে হবে। একটি শিশু সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, তা নিশ্চিত করা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা।’ তিনি মানবসম্পদকে দেশের সবচেয়ে বড় নিয়ামত উল্লেখ করে আগামী এক বছরের মধ্যে টেকসই ও ফলপ্রসূ পাইলট প্রোগ্রাম ডিজাইন করে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘পরের বছর আমি দেখতে চাই, পাইলট প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা কত শতাংশ শিশুকে শ্রম থেকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে পেরেছি।’
শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরির জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রতিটি মসজিদে জুমার খুতবায় শিশুশ্রমের কুফল নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। একইভাবে রামকৃষ্ণ মিশন, বৌদ্ধবিহার, চার্চসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়কে সচেতনতা তৈরিতে কাজে লাগাতে হবে।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে এডুকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল হামিদ শিশুশ্রম নিরসনে খাতভিত্তিক পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সিএলইপির যৌথ উদ্যোগ তুলে ধরেন। সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুর রহমান তারফদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন। ‘বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ ও সবার যৌথ দায়িত্ব’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় সরকারি কর্মকর্তা, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং আইএলওর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।



