আয়কর অডিট তালিকায় নাম আসলে করণীয় কী? বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
আয়কর অডিট তালিকায় নাম আসলে করণীয় কী?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আরও প্রায় পাঁচ হাজার আয়কর রিটার্নকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করেছে। ২০২৩-২৪ করবর্ষের জন্য জমা দেওয়া এসব রিটার্ন অডিট করা হবে। জুনের শেষে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।

এখন পর্যন্ত কত রিটার্ন নিরীক্ষার আওতায়?

এনবিআর এর আগে গত বছরের জুলাই মাসে প্রথম পর্যায়ে র‍্যান্ডম সিলেকশন পদ্ধতিতে ১৫ হাজার ৪৯৪টি রিটার্ন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে চলতি বছরের এপ্রিলে আরও ৭২ হাজার ৩৪১ রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করে ওয়েবসাইটে তালিকা প্রকাশ করেছিল। সর্বশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে মোট অডিটের আওতায় আসা রিটার্নের সংখ্যা ৯২ হাজারের বেশি।

অডিট প্রক্রিয়া কীভাবে চলবে?

এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা নিরীক্ষার জন্য মনোনীত হয়েছেন তাদের পর্যায়ক্রমে শুনানির জন্য ডাকা হবে। শুনানি শেষে কোনো বাড়তি কর আরোপের সিদ্ধান্ত হলে সেটি এক মাসের মধ্যেই করদাতাকে জানিয়ে দেবে সংশ্লিষ্ট কর অফিস। এনবিআরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রথম দফায় চিঠি দিয়ে অবহিতকরণের পরে আবার চিঠি দিয়ে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে করদাতাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিংবা ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আয়কর আইন অনুযায়ী, উপ-কর কমিশনার কোনো করদাতার কর নির্ধারণের জন্য যদি করদাতার উপস্থিতি বা কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণাদির প্রয়োজন বিবেচনা করেন, তাহলে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে শুনানির জন্য ডাকবেন। শুনানিতে করদাতা নিজে বা তার প্রতিনিধিকে উপ-কর কমিশনারের কাছে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

করদাতাদের মধ্যে উদ্বেগ কেন?

সরকারি হিসেবে, দেশে এখন প্রায় সোয়া এক কোটি কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) আছেন। এর মধ্যে ৪২ লাখের বেশি টিআইএন নম্বরধারী বিদায়ী করবর্ষে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিরীক্ষার জন্য টিআইএন নির্বাচন চালুর পর অনেক করদাতার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে আয়কর দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়, বিশেষ করে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ অনেক পুরনো।

বিশেষজ্ঞ কী বলছেন?

অডিট ও আয়কর আইন বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলছেন, দেশে এখনো অনেকেই কর ফাঁকি দিয়ে থাকেন কিংবা কর ফাঁকির জন্য অনেকের আয়কর রিটার্নে যথাযথ তথ্য দেওয়া থাকে না। নিয়মিত নিরীক্ষা এ প্রবণতা কমিয়ে আনবে। তিনি বলেন, "আয়কর অডিট নিয়ে সৎ করদাতা ও সঠিক রিটার্ন জমাদানকারীর ভীত বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।"

স্নেহাশীষ বড়ুয়া আরও বলেন, "আগে কার ফাইল অডিট হচ্ছে সেটা জানাই যেত না। এখন এনবিআর অটোমেটেড পদ্ধতিতে সিলেক্ট করে ওয়েবসাইটে দিচ্ছে। ফলে কোন ফাইল নিরীক্ষা হবে সেটা ঠিক করার বিষয়ে স্বচ্ছতা এসেছে। অন্যদিকে ই-রিটার্ন চালু হওয়ায় ফাইল লুকানো কিংবা হারিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিরও অবসান হলো।" তবে তিনি পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে করার পরামর্শ দেন, যাতে করদাতাদের হয়রানির আশঙ্কা কাটে।

নির্বাচিত করদাতার অভিজ্ঞতা

ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা এ কে এম হেদায়েত উল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি গত মে মাসে উপকর কমিশনারের কার্যালয় থেকে একটি চিঠি পেয়েছেন, যেখানে তাকে জানানো হয়েছে যে তার ২০২৩-২৪ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন সম্পূর্ণ অটোমেটেড পদ্ধতিতে অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। তিনি বলেন, "এটুকুই এখন পর্যন্ত বলা হয়েছে। হয়তো পরে চিঠি দিয়ে জানানো হবে যে আমাকে কী করতে হবে। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমি তাদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবো।"

অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক

এর আগে গত ২৮ জুন ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করে নির্দেশনা জারি করেছিল এনবিআর। তবে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সের করদাতা, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা, মৃত করদাতার পক্ষে প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছে।

অডিটের উদ্দেশ্য ও স্বচ্ছতা

আয়কর রিটার্ন অডিট নির্দেশনা ২০২৫ অনুযায়ী, অডিটের উদ্দেশ্য হলো কর ফাঁকি প্রতিরোধ, কর পরিহারের প্রবণতা রোধ ও সুস্থ কর সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করা, করদাতা কর্তৃক আয়কর আইন ও বিধি যথাযথভাবে পরিপালন নিশ্চিত করা, কর ফাঁকির ক্ষেত্র, পদ্ধতি ও ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং আয়কর কর্মকর্তা কর্তৃক আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

গত ২৬ এপ্রিল এনবিআর ভবনে প্রাক বাজেট আলোচনা সভায় তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছিলেন, "এই প্রক্রিয়ায় কোনো ম্যানুয়াল ইন্টারঅ্যাকশন নেই, এটি টোটালি সিস্টেম জেনারেটেড। ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।"

কর্মকর্তারা বলছেন, এসব বিষয়ে আয়কর রিটার্নে সঠিক তথ্য এসেছে কি-না কিংবা যথাযথ কর পরিশোধ করা হয়েছে কিনা সেটি এতদিন ম্যানুয়ালি দেখা হতো। ফলে অনেকের অভিযোগ ছিল যে তাকে হয়রানির জন্য তার আয়কর রিটার্ন নিরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় গত বছরের শেষ দিক থেকে অটোমেটেড পদ্ধতিতে নিরীক্ষার জন্য আয়কর রিটার্ন বাছাই শুরু করে এনবিআর।