মুদি দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা সরকারের
মুদি দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা

দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ মুদি দোকান, কসমেটিকসের দোকান, বিউটি পার্লার, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব এবং জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

কেন মুদি দোকানের দিকে নজর?

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশের বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হয়, যেখানে আয় ও বিক্রির সঠিক হিসাব সরকারের কাছে নেই।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে। কিন্তু দেশে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েক কোটি। শুধু বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবেই খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। ফলে সরকারের দৃষ্টিতে বিশাল একটি অর্থনৈতিক খাত এখনো কার্যত রাজস্ব ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কী ধরনের কর আসতে পারে?

বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি নির্ধারিত সীমার নিচে, তাদের জন্য টার্নওভার করের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই ব্যবস্থার আওতায় আসেন না। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকৃত বিক্রির হিসাবের ওপর কর নির্ধারণ না করে ব্যবসার ধরন, অবস্থান, দোকানের আকার এবং বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কর ধার্য করা হতে পারে।

এনবিআর সূত্র বলছে, বছরে এক হাজার, পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকার মতো নির্দিষ্ট কর নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। যদিও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্যাকেজ ভ্যাটের পুরোনো অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশে এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে প্যাকেজ ভ্যাটের ব্যবস্থা ছিল। পরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজীকৃত পদ্ধতিতে থোক বা প্যাকেজ ভ্যাট চালু করা হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিরোধিতা, বাস্তবায়ন জটিলতা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে নতুন ভ্যাট আইনে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে করের চাপ থেকে মুক্ত রাখতে নির্দিষ্ট সীমার নিচে থাকা প্রতিষ্ঠানকে টার্নওভার কর ও ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এখন আবার সেই প্যাকেজভিত্তিক বা সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছে সরকার।

বাস্তবতা কতটা কঠিন

মুদি দোকানকে করের আওতায় আনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— তাদের পরিচিতি ও তথ্যভাণ্ডার। দেশের হাজার হাজার গ্রাম, উপজেলা, বাজার ও শহরতলিতে অসংখ্য দোকান রয়েছে— যাদের কোনও নিবন্ধন নেই। অনেকের ট্রেড লাইসেন্স নেই, টিআইএন নেই, ব্যাংক হিসাব নেই। ব্যবসার আয়-ব্যয়ের কোনও আনুষ্ঠানিক নথিও সংরক্ষিত হয় না।

রমনা এলাকার একজন মুদি দোকানির ভাষায়, “একটা ছোট দোকান দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। আমাদের আবার ট্যাক্স কী?” এই মনোভাব শুধু একজন দোকানির নয়, দেশের লাখো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বাস্তবতা প্রায় একই। ফলে এনবিআরের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে— প্রথমে দোকানগুলোকে শনাক্ত করবে কীভাবে, তারপর কর আদায় করবে কীভাবে?

অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন

অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষুদ্র ব্যবসাকে করের আওতায় আনা প্রয়োজন। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। শুরুতে দোকানের আকার, অবস্থান ও বিক্রির সম্ভাব্য পরিমাণের ভিত্তিতে একটি নির্ধারিত কর আরোপ করা যেতে পারে। তার মতে, এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধন, ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু রাজস্ব আদায় নয়, অর্থনীতির প্রকৃত আকার নির্ধারণ, ব্যবসার তথ্যভান্ডার তৈরি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা

তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বিষয়টিকে এতটা সহজভাবে দেখছে না। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতারা মনে করেন, অতীতে প্যাকেজ ভ্যাট কার্যকর হয়নি। নতুন নামে একই ব্যবস্থা চালু করা হলে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ বাড়বে। তাদের আশঙ্কা, মাঠপর্যায়ে কর কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত তদারকি ও হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, বছরে নির্দিষ্ট করের অঙ্ক ছোট মনে হলেও ক্ষুদ্র মূলধনের ব্যবসার ক্ষেত্রে সেটি বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গত ২৪ জুন সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী মুদি দোকান, প্রসাধনী দোকানসহ ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ও করের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “ভ্যাট ব্যবস্থার মূল নীতি হলো— ভোক্তা ভ্যাট পরিশোধ করবে এবং ব্যবসায়ী কেবল তা সরকারের পক্ষে সংগ্রহ করবে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে ভোক্তার কাছ থেকে কার্যকরভাবে ভ্যাট আদায় করবে, তা স্পষ্ট নয়। একইসঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানকে কর ও ভ্যাটের আওতায় এনে প্রকৃতপক্ষে কত রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে, সে বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে সুনির্দিষ্ট কোনও পরিসংখ্যান আছে কিনা, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।”

হেলাল উদ্দিন বলেন, “১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের সময় অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান দেশে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেন। তখন হাট-বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপ না করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।” কিন্তু বর্তমানে সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন। তিনি আরও বলেন, “ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভ্যাট ও আয়কর নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। বিশেষ করে আয়কর আইনের ২১৬ ধারার বিভিন্ন বিধান করদাতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।” ব্যবসায়ীদের দাবি, কর ব্যবস্থাকে আরও মানবিক ও করদাতাবান্ধব করা প্রয়োজন। নতুন করদাতাদের উৎসাহিত করতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর নির্ধারণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একইসঙ্গে কর ও ভ্যাট পরিশোধের পর বছর শেষে করদাতাকে একটি সনদ দেওয়ার প্রস্তাবও করেন তারা।

হেলাল উদ্দিনের মতে, ভ্যাট চালুর সময় সরকার আবগারি শুল্ক ও বিক্রয় করের পরিবর্তে আধুনিক করব্যবস্থা হিসেবে এটি প্রবর্তনের কথা বলেছিল। সেই সময় এসএমই খাতের ব্যবসাগুলোকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে অতি স্বল্প বিক্রয়কারী অনেক ক্ষুদ্র দোকানকেও ভ্যাটের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, “দেশে বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর মধ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) আওতাধীন ১০৯টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬০ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করেছে। অন্যদিকে প্রায় ৫ হাজার বড় প্রতিষ্ঠান মোট ভ্যাট আয়ের ৯৮ শতাংশ সরবরাহ করেছে।” ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি না করে বড় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি রোধে গুরুত্ব দিলে রাজস্ব আহরণ আরও বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

ভোক্তার ওপর প্রভাব পড়বে কি

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই। সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা হলে দোকানদাররা সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন। ফলে অতিরিক্ত করের বোঝা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রীর ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও সরকারের যুক্তি হচ্ছে, করের পরিমাণ খুব সীমিত রাখা হবে এবং এটি ব্যবসায়ীদের জন্য জটিল হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।

রাজস্ব বাড়বে কতটা? এখানেও প্রশ্ন রয়েছে। লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সামান্য অঙ্কের কর আদায় করতে বিপুল প্রশাসনিক ব্যয় প্রয়োজন হবে। মাঠপর্যায়ে জরিপ, নিবন্ধন, তদারকি ও সংগ্রহ ব্যবস্থার খরচ অনেক ক্ষেত্রে আদায়কৃত করের তুলনায় বেশি হতে পারে। কর বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, ক্ষুদ্র দোকানিদের পেছনে না ছুটে উৎপাদক, আমদানিকারক ও বড় ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ককে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে আরও বেশি রাজস্ব পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ইনভয়েসিং এবং সরবরাহ শৃঙ্খলভিত্তিক নজরদারি জোরদার করলে রাজস্ব ফাঁকি অনেকাংশে কমানো যাবে।

সব মিলিয়ে, মুদি দোকানকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ সরকারের রাজস্ব সংস্কারের অংশ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন কৌশল, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কতটা আস্থাভিত্তিক হয় তার ওপর। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বিস্তৃত কিন্তু সবচেয়ে কম নথিভুক্ত খাতকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা শুধু রাজস্ব সংগ্রহের বিষয় নয়; এটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া।