আগামী ছয় মাসের জন্য সব ধরনের জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে বর্তমানে যে হারে মুনাফা দেওয়া হচ্ছে, সেটিই বহাল থাকবে। শিগগির এই বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।
হার অপরিবর্তিত রাখার কারণ
নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস পরপর বাজার পরিস্থিতি ও সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বিবেচনায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করা হয়। তবে এবারও হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করে। তাই তাদের স্বার্থ বিবেচনায় বর্তমান মুনাফার হার বহাল রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “সরকার চাইলে সুদের হার কমিয়ে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারতো। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় সেই পথে না গিয়ে বিদ্যমান হারই বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
পূর্ববর্তী পরিবর্তন
এর আগে ২০২৫ সালের ১ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কিছুটা কমিয়েছিল। একই সঙ্গে প্রতি ছয় মাস পরপর হার পুনর্নির্ধারণের নীতিও চালু করা হয়।
কোন সঞ্চয়পত্রে কত মুনাফা
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফা পান। এর বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার কিছুটা কম।
বর্তমানে বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
- পেনশনার সঞ্চয়পত্র: সর্বোচ্চ ১১.৯৮ শতাংশ।
- পরিবার সঞ্চয়পত্র: সর্বোচ্চ ১১.৯৩ শতাংশ।
- পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র: সর্বোচ্চ ১১.৮৩ শতাংশ।
- তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র: সর্বোচ্চ ১১.৮২ শতাংশ।
- ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের তিন বছর মেয়াদি হিসাব: সর্বোচ্চ ১১.৮২ শতাংশ।
তবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের আগে এসব সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার ১২ শতাংশেরও বেশি ছিল।
বাজেটে কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন
নতুন অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা ১০ শতাংশ উৎসে কর (অগ্রিম কর) সংক্রান্ত নিয়মে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, উৎসে কেটে রাখা কর আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হবে না। অর্থবছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে প্রকৃত করের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে। যদি কোনও বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর কেটে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে তিনি সেই অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাবেন।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বাধ্যতামূলক। ফলে যেসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর করযোগ্য আয় নেই, কিন্তু উৎসে কর কাটা হয়েছে, তাদের অতিরিক্ত কর ফেরত পেতে টিআইএন নিয়ে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। রিটার্নে ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিলে যাচাই-বাছাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত কর ফেরত দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার একদিকে মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের আয় সুরক্ষায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রেখেছে, অপরদিকে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে উৎসে কাটা কর সমন্বয়ের সুযোগ চালু করেছে। ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীরা যেমন বর্তমান মুনাফার সুবিধা অব্যাহতভাবে পাবেন, তেমনি করযোগ্য আয় না থাকলে অতিরিক্ত কর ফেরত পাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।



