এনবিআর প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য: আয়কর ছাড় জিডিপির ২.৩৯ শতাংশ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয়কর ছাড়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৩৯ শতাংশের সমান। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের প্রায় ৯৯ শতাংশের সমপরিমাণ করছাড় দেওয়া হচ্ছে, যা রাজস্ব নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে।
করপোরেট ও ব্যক্তিগত খাতে ছাড়ের বিশাল ব্যবধান
এনবিআরের বিশ্লেষণ অনুসারে, করছাড়ের সিংহভাগই উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কেন্দ্রীভূত। করপোরেট করে ছাড় দেওয়া হয়েছে ৭৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা, যা মোট করছাড়ের ৬৯ শতাংশ। এই ছাড় প্রধানত নিম্নলিখিত খাতগুলোতে বেশি মাত্রায় প্রযোজ্য:
- ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক কল্যাণ খাত
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টর
- তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও আনুষঙ্গিক শিল্প
অন্যদিকে, ব্যক্তিগত আয়করে ছাড়ের পরিমাণ ৩৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যা মোটের ৩১ শতাংশ। এখানে বেতন খাতের করছাড়ই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, যা ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা বয়ে এনেছে।
কোন খাতে কত অব্যাহতি: বিস্তারিত বিবরণ
প্রতিবেদনে করছাড়ের খাতভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। করপোরেট করের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা ছাড় পেয়েছে। এরপরই রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, যেখানে ছাড়ের পরিমাণ ৭ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে মূলধনি আয় খাত ৭ হাজার ৭১ কোটি টাকা ছাড় পেয়েছে, আর তৈরি পোশাক শিল্প ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার সুবিধা ভোগ করেছে।
ব্যক্তি পর্যায়ে, বেতন আয় খাতে ৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার করছাড় শীর্ষে। এছাড়া পোলট্রি ও মাছ চাষের সঙ্গে জড়িতদের ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ৮১৭ কোটি টাকার করছাড় উল্লেখযোগ্য।
করছাড় নিয়ে বিতর্ক ও সংস্কারের প্রস্তাব
প্রতিবেদনে করছাড় নিয়ে বিদ্যমান বিতর্কের দিকেও আলোকপাত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো এই করছাড়ের সুবিধা ভোগ করায় সরকার প্রকৃত করপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার, তৈরি পোশাকসহ কিছু শিল্প খাত করছাড়ের মাধ্যমে এগিয়ে গেলেও এখন এসব খাতে ছাড়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, কর অব্যাহতি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে উৎসাহিত করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যদিও করছাড়ে সাময়িক রাজস্ব ক্ষতি হয়, তবুও এটিকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে, ধাপে ধাপে করছাড় কমানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে একটি সংস্কার কর্মপরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সবুজ অর্থনীতি, এসএমই প্রবৃদ্ধি, লিঙ্গসমতা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের মতো জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে প্রণোদনা সামঞ্জস্য করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তাবলির অংশ হিসেবে করছাড় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এবং এনবিআর এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।



