তামাক খাতে কর নীতির সংস্কার জরুরি: অর্থনীতিবিদদের মতামত
অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা মত প্রকাশ করেছেন যে তামাক খাতে কর নীতি সহজ, স্বচ্ছ, অনুমানযোগ্য এবং টেকসই হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার পাশাপাশি রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত কর কাঠামো প্রণয়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
গোলটেবিল আলোচনায় উঠে আসা মূল বক্তব্য
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) কার্যালয়ে “তামাক কর: স্বল্পমেয়াদী রাজস্ব বনাম দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা” শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং-এর একজন প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। পিআরআই-এর গবেষণা পরিচালক বজলুল হক খন্দকার উদ্বোধনী বক্তব্য দেন এবং পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান আলোচনা সঞ্চালনা করেন।
তামাক কর ও রাজস্ব বৃদ্ধির বর্তমান চিত্র
প্রধান নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং-এর বাংলাদেশের সিগারেট বাজার সম্পর্কিত সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, যদিও ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে তামাক খাতে করের হার ও মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে, তবুও রাজস্ব বৃদ্ধি প্রত্যাশিত হারে হয়নি। বিশেষ করে, জুন ২০২৪ এবং জানুয়ারি ২০২৫-এ সিগারেটের মূল্য ও শুল্কে বড় ধরনের বৃদ্ধি বিক্রয় হ্রাসের দিকে নিয়ে গেছে, যা রাজস্বের ওপর প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে বর্তমানে দেশে তামাক পণ্যের মোট করের হার প্রায় ৮৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ হারগুলোর মধ্যে একটি। এই পরিস্থিতিতে, শুধুমাত্র করের হার বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। বরং, আকস্মিক কর ও মূল্য সমন্বয় বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এবং অবৈধ বাণিজ্য সম্প্রসারণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
বাজার বিকৃতি ও কর কাঠামোর জটিলতা
বক্তারা বলেছেন যে ঘন ঘন কর ও মূল্য পরিবর্তনের কারণে ভোক্তারা তুলনামূলকভাবে কম দামের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন, যা বাজার কাঠামোকে বিকৃত করছে। একই সময়ে, উচ্চ ও নিম্ন-স্তরের পণ্যের মধ্যে মূল্যের ব্যবধান বাজারে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করছে। তারা উল্লেখ করেছেন যে বর্তমান বহু-স্তরীয় কর কাঠামোর জটিলতার কারণে রাজস্ব পূর্বাভাস দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই, মূল্য-ভিত্তিক কর ব্যবস্থা থেকে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থায় রূপান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে।
অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও সুপারিশ
বক্তারা অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজার নিবিড় পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং কারখানা পর্যায়ে উৎপাদন তদারকিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন। তারা সতর্ক করেছেন যে বর্তমান কর কাঠামোর কারণে বৈধ উৎপাদকদের মুনাফা কমে যাওয়ায় অবৈধ বাণিজ্য তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ, স্বচ্ছ ও দূরদর্শী কর নীতি প্রয়োজন।
বক্তাদের মতে, একটি সুসংগত ও বাস্তবসম্মত কর কাঠামো প্রণয়নের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে টেকসই বৃদ্ধি নিশ্চিত করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং তামাক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অপরিহার্য। তারা আরও উল্লেখ করেন যে কর নীতির সরলীকরণ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থিতিশীলতা আনতে পারে এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।



