দেশের চলমান অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি ও ভোগব্যয় হ্রাস এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা সরকারের রাজস্ব আদায়ে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকারও বেশি।
ঘাটতির চিত্র
এনবিআরের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪২১ দশমিক ২৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস খাত থেকে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ দশমিক ১৬ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ভোগব্যয় সংকুচিত হওয়ায় বাজারে বিক্রি কমেছে, যা সরাসরি ভ্যাট আদায়ে প্রভাব ফেলেছে। একই সময়ে, শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেক কোম্পানি তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। এর ফলে আয়কর ও আমদানি শুল্ক আদায় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।
তবে কিছু প্রবৃদ্ধি
বিশাল ঘাটতি সত্ত্বেও, এনবিআর রাজস্ব আদায়ে কিছু প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর—এই তিনটি প্রধান উৎসের কোনোটিই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। যদিও কাস্টমস খাতে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ভ্যাটে ১১ দশমিক ১ শতাংশ এবং আয়করে ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ নীতি действует, যা আমদানি নির্ভর রাজস্ব আদায়ে চাপ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ভ্যাট আদায় কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না।
এপ্রিলের হতাশাজনক চিত্র
এপ্রিল মাসের চিত্রও হতাশাজনক ছিল। এই মাসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৬০৮ দশমিক ৭৭ কোটি টাকা। তার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৯ হাজার ৬০ কোটি টাকা। তবুও, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এপ্রিলে কাস্টমস খাতে ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং আয়কর খাতে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ভ্যাট খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ভোগ ও ক্রয়ক্ষমতার দুর্বলতা এখনও রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয় ও ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন শর্ত পূরণের চাপও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।



