রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘গ্রিন সিটি’ আবাসন প্রকল্পে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনায় সরকারি দরের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি অর্থ পরিশোধের তথ্য উঠে এসেছে নতুন নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। সরকারি হিসাবে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা, কিন্তু খরচ দেখানো হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
এক ভবনেই ১৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত
উদাহরণ হিসেবে ৭ নম্বর ভবনের তথ্য উল্লেখযোগ্য। সেখানে উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি দাম ছিল ১০ লাখ টাকার কিছু বেশি, অথচ বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একটি ট্রান্সফরমারের সরকারি দর ৪০ লাখ টাকা হলেও ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। নিম্ন ভোল্টেজ সরঞ্জাম, পাওয়ার ফ্যাক্টর প্যানেল ও জেনারেটরের দামও কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। ফলে মাত্র একটি ভবনেই প্রায় ১৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
পরিকল্পিত কারসাজি ও বিধি লঙ্ঘন
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরপত্র এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে মোট ব্যয় দাপ্তরিক প্রাক্কলনের কাছাকাছি থাকে, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে সামগ্রিক হিসাব ‘গ্রহণযোগ্য’ রাখা হয়েছে। সরকারি ক্রয় বিধিমালার মৌলিক নিয়ম উপেক্ষা করে কোনো দরদাতার অস্বাভাবিক মূল্য প্রস্তাবের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়নি, জামানত বাড়ানো হয়নি, এবং অনুমোদিত প্রাক্কলন কমিটির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও তদন্তের দাবি
এই ঘটনায় তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোট প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অতীতে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। নিরীক্ষা বিভাগ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ ফেরতের সুপারিশ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্পে দুর্নীতি না হয়।
পূর্বে বালিশ-কাণ্ডেও দুর্নীতি
এর আগে রূপপুর প্রকল্পে ‘বালিশ-কাণ্ড’ জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়েছিল। মোট ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়, যার অনেকগুলোর দাম ছিল প্রতিটি ৯০ হাজার টাকা। একটি ড্রেসিং টেবিলের বাজারদর ৩০ হাজার ৫০০ টাকা হলেও সরকারি নথিতে দাম দেখানো হয় ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রকল্পগুলোর একটি, যা জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত। আবাসন খাতে এমন লুটপাট ঘটলে মূল প্রকল্পের অন্যান্য অংশেও দুর্নীতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।



