দেশে গরম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি। উল্টো তিনটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি আরও বেড়েছে। এর প্রায় পুরো চাপ পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা, কোথাও আরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। টিভিতে ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দেখতে না পেরে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন অনেকে।
লোডশেডিংয়ের চিত্র
বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দফায় দফায় দাম বাড়লেও গত কয়েক বছর গরমের সময় লোডশেডিং কমছে না। চলতি মাসেও বিদ্যুতের সর্বোচ্চ দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ গত কয়েক দিনে দেশে দিনে গড়ে সর্বোচ্চ তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। গতকাল দিনের বেলায়ও সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল প্রায় ২ হাজার ৬২৯ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) ও বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎঘাটতি সামাল দিতে মূলত ঢাকার বাইরের এলাকায় লোডশেডিং করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) গ্রাহকদের ওপর। সংস্থাটি ৮০টি সমিতির মাধ্যমে দেশের অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
পিডিবি ও আরইবি সূত্র বলছে, সারা দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে মঙ্গলবার রাত ১২টায় ৩ হাজার ২৭৫ মেগাওয়াট। একই সময় আরইবির লোডশেডিং ২ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট।
উৎপাদন ঘাটতি ও কারণ
পিডিবি ও পিজিবির হিসাবে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও কয়েক দিন ধরে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। দিনের বেশির ভাগ সময় উৎপাদন থাকছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে, অথচ চাহিদা ছাড়িয়ে যাচ্ছে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। বকেয়া বিল, জ্বালানিসংকট ও কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক অব্যবহৃত থাকছে।
কারিগরি ত্রুটিতে বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ায় আরও ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। ইউনিটটি চালু হতে এক সপ্তাহ লাগতে পারে।
বকেয়া বিল ও জ্বালানিসংকট
সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেনে পিডিবি। তবে কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রগুলোর বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না সংস্থাটি। বর্তমানে পিডিবির বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। সংস্থাটির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ায় নতুন করে বকেয়া জমা কমতে পারে, তবে পুরোনো পাওনা পরিশোধে সময় লাগবে।
গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকেও উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। গত ২০ মে দেশে রেকর্ড ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কয়লা থেকে এসেছিল ৬ হাজার ৮১ মেগাওয়াট। এখন তা কমে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটে নেমেছে।
প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিল বকেয়া থাকায় প্রয়োজনীয় কয়লা কিনতে পারছে না চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র। এক সপ্তাহ ধরে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমেছে ৬০০ মেগাওয়াট। কারিগরি ত্রুটিতে বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ায় আরও ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। ইউনিটটি চালু হতে এক সপ্তাহ লাগতে পারে। একই ধরনের সমস্যায় বন্ধ হওয়া পটুয়াখালীর আরএনপিএল-নরিনকো কেন্দ্রের একটি ইউনিট মঙ্গলবার চালু হয়েছে; সেখান থেকে ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকেও সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করা হচ্ছে না। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা হলেও দিনের অধিকাংশ সময় উৎপাদন থাকে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট। কেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। বকেয়ার পাশাপাশি তেলে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় পিডিবিও এসব কেন্দ্র সীমিত সময় চালাতে চায়।
নিজস্ব কয়লায় পরিচালিত দেশের একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়াতেও সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন খুব কম। তিনটি ইউনিটের মোট সক্ষমতা ৪৫০ মেগাওয়াট হলেও কয়লা মজুত থাকার পরও কেন্দ্রটি গড়ে মাত্র ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হবে। পটুয়াখালীর একটি কেন্দ্র থেকে কয়লা এনে বাঁশখালীর বন্ধ ইউনিট চালুর চেষ্টা চলছে। রামপালের ইউনিটটিও চালু হলে সরবরাহ কিছুটা বাড়বে।
বিশ্বকাপ দেখতে না পারায় ক্ষোভ
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের গোরকপুর গ্রামের জাকিরুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ মাঝেমধ্যে আসে, আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা থাকার পর আবার চলে যায়। তাই তাঁকে মুঠোফোনে খেলা দেখতে হচ্ছে। নেত্রকোনার রাসেল আহমেদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৭ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। একই জেলার খালিয়াজুরি উপজেলার পুরানহাটি গ্রামের শামছুর রহমানের প্রত্যাশা, অন্তত বিশ্বকাপের খেলা চলার সময় যেন বিদ্যুৎ থাকে।
নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন গতকাল বিকেলে জানান, তাঁদের এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ১০৪ মেগাওয়াট, সরবরাহ পাওয়া গেছে ৫৪ মেগাওয়াট। এ কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (কারিগরি) সীমা রানী কুণ্ডুর ভাষ্য, সেখানে চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বকাপ খেলা দেখতে জেলার কাহারোল উপজেলার বলরামপুর যুব উন্নয়ন সমিতি চাঁদা তুলে ধারদেনা করে টিভি কিনেছিল। সমিতির সদস্য আরিফুল ইসলাম বলেন, এখন বিদ্যুৎ না থাকায় খেলা দেখা যাচ্ছে না।
লোডশেডিং বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে আনন্দকে অনেকটা ম্লান করে দিয়েছে বলে জানান জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ বাবু মিয়া। তিনি বলেন, খেলা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই বিদ্যুৎ চলে যায়, আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসতে আসতে ম্যাচ শেষ হয়ে যায়।
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মো. রাসেল মিয়া বলেন, চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎও পাওয়া যাচ্ছে না। নিরুপায় হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে অর্ধেক বিদ্যুৎ
ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় মঙ্গলবার রাত ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮৭ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছে ৪৮ মেগাওয়াট। গতকাল সকাল ৮টায় চাহিদা ছিল ৮২ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৪৬ মেগাওয়াট।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩–এর ডিজিএম (কারিগরি) এম এম রায়হানুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলায় গড়ে ১২ ঘণ্টা করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আর অন্য উপজেলাগুলোতে ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং রাখতে হচ্ছে। বিশ্বকাপ খেলা উপলক্ষে বিদ্যুতের লোডশেডিং হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
নীলফামারী নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রশান্ত কুমার রায় প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট। এ জন্য এক ঘণ্টা করে তিন থেকে চারবার লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
৩৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট উল্লেখ করে দিনাজপুর নেসকো-২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, জামালপুর থেকে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী ও রাজীবপুর এলাকাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বিদ্যুতের চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার পাগলা শ্যামনগর গ্রামের খান মাহমুদ আরিফুল হক বলেন, কয়েক দিন ধরে দিনের মধ্যে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ যাচ্ছে। বাগেরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ৩৪ শতাংশ। তবে বিশ্বকাপের ম্যাচ চলার সময় আধা ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, দাম বাড়িয়ে বিদ্যুৎ দিতে পারবে না, এটা আগে থেকেই বলা হয়েছে; বরং খরচ কমানো দরকার। সরকারি হিসাবের চেয়ে বাস্তবে লোডশেডিং আরও বেশি। আর গ্রামের মানুষের চাহিদা কম, তা–ও তাদের বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অন্তত সমতাভিত্তিক হলে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি গ্রামে কিছুটা কমতে পারে।



