কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) দুটি কারখানা গ্যাস–সংযোগের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। একটি কাচ তৈরির কারখানা, অন্যটি রডের। দুই কারখানায় মোট বিনিয়োগ প্রায় ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা, যার অধিকাংশই দেশি-বিদেশি ঋণ। বছরে সুদ দিতে হয় প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা।
গ্যাস সংযোগ না থাকায় কারখানা অচল
কাচের কারখানাটি নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় আড়াই বছর আগে, আর রডের কারখানার কাজ শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। এমজিআই বিনিয়োগের সময় গ্যাস–সংযোগের আশ্বাস পেয়েছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি নিজেরাই ৫৫০ কোটি টাকা খরচ করে গ্যাসলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করেছে; কিন্তু গ্যাস–সংযোগ পাওয়া যায়নি।
এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল ২০ জুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই বিনিয়োগ বিদেশি ঋণে হয়েছে। বিদেশি ঋণে তো আর রিশিডিউল (পুনঃ তফসিল) করা যায় না। সুদও মাফ পাওয়া যায় না। গ্যাস না পেলে কারখানা দুটি চালু করা যাবে না।’ তিনি আরও জানান, কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট সাতটি কারখানায় ১৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা, কিন্তু সবকিছু থেমে আছে গ্যাসের অভাবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সভায় ২০ জুন বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন।
শুধু এমজিআই নয়, বিপাকে আরও শিল্পগোষ্ঠী
শুধু এমজিআই নয়, ছোট, মাঝারি ও বড় বেশ কিছু শিল্পগোষ্ঠী কারখানায় গ্যাস–সংযোগ না পেয়ে বিপাকে আছে। কেউ কেউ বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে গেছে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসিসহ ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে শিল্প সংযোগের ১ হাজার ৮০০টির বেশি আবেদন জমা আছে। এর মধ্যে ৫৫০টির মতো প্রতিষ্ঠান সব প্রক্রিয়া শেষ করে সংযোগের (প্রতিশ্রুত সংযোগ) অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী গত ২০ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিবকে একটি চিঠি দেন, যেখানে পাঁচটি কারখানার কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে দুটি এমজিআইয়ের। তিনি বলেন, গ্যাস–সংযোগ দিতে না পারলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান হবে না এবং ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন।
সিটি গ্রুপ ও হা-মীম গ্রুপের সংকট
সিটি গ্রুপের হোসেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চলে পাঁচটি শিল্পকারখানা গ্যাসের অভাবে চালু করতে পারছে না তারা। সিমেন্ট, চিনি, কাগজ, জাহাজ ও এলপিজি কারখানায় তাদের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে রয়েছে। সিটি গ্রুপ সূত্র জানিয়েছে, ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজেরা পাইপলাইন তৈরি করে দেওয়ার পরও সরকার গ্যাস দিতে পারেনি। গ্যাস পেলে কারখানাগুলো ২০২২ সালে চালু করা যেত।
গাজীপুরের মাওনায় একটি বস্ত্র কারখানা করে বিপাকে পড়েছেন হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুই বছর আগে গ্যাস–সংযোগের জন্য টাকা জমা দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সংযোগ পাননি, ফলে কারখানা চালু করা যাচ্ছে না। গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা করে সুদ গুনতে হচ্ছে। কবে নাগাদ গ্যাস পাওয়া যাবে, তা জানি না। এ ক্ষতি আর টানতে পারছি না।’
গ্যাস সংকটের দীর্ঘ ইতিহাস
দেশে গ্যাসের সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে গ্যাস উত্তোলনে নজর না দিয়ে আমদানিতে জোর দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। ২০২২ সালের দিকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমতে থাকায় গ্যাস আমদানি কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যেখানে চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কিছু কিছু কারখানায় গ্যাস দেওয়ার বিষয়টি সরকারের চিন্তায় রয়েছে। তবে একই শিল্পগোষ্ঠীর সব কারখানা গ্যাস পাবে না; বরং সবাইকে কিছু কিছু গ্যাস দেওয়ার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। তিনি বলেন, সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে জোর দেওয়া হয়েছে।
সমাধানের পথ কী?
দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমছে উদ্বেগজনক হারে। জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে গ্যাসক্ষেত্র আছে ২৯টি। এতে থাকা উত্তোলনযোগ্য মজুত দিয়ে বর্তমান হারে উৎপাদন করলে চলা যেতে পারে সাত থেকে আট বছর। বর্তমান সরকার কূপ খনন বাড়ানো এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর বাড়তি জোর দিচ্ছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান দেখছেন না। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি খাতে সুশাসন ও ব্যয় কমানো দরকার। আমদানির ওপর নির্ভর করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আগামী চার-পাঁচ বছর গ্যাস–সংকট থাকবেই। এ সময়ে অভ্যন্তরীণ উত্তোলন বাড়ানো ও ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিকল্প হিসেবে ভাবা যেতে পারে। মধ্য মেয়াদে যাতে গ্যাস–সংকট কেটে যায়, সে জন্য এখন থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।’



