চীনে চুক্তির পথে সৌরবিদ্যুৎ খাত: চিফ হুইপের বড় ঘোষণা
চীনে চুক্তির পথে সৌরবিদ্যুৎ খাত: চিফ হুইপের বড় ঘোষণা

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে সৌরবিদ্যুৎ চুক্তির সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরে সোলার (সৌরবিদ্যুৎ) খাতের উন্নয়নে চীনের সঙ্গে একটি বড় ধরনের চুক্তি সই হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর গুলশানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব: জাতীয় বাজেটের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।

নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে চায়না আছেন, এখনো ডিসিশন হয়নি, আপনারা দেখবেন বড় চুক্তি হবে আমাদের সোলার ব্যাপারটা নিয়ে।’ দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে বিএনপি সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করতে চায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের অগ্রাধিকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি

চিফ হুইপ বলেন, দেশে টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (রিনিউয়েবল এনার্জি) খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। দেশের সামগ্রিক কল্যাণে এবং একটি ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরিতে এই খাতকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকার ইতিমধ্যেই সব সরকারি ভবনের ছাদ (রুফটপ) ও শিল্পকারখানাগুলোকে সোলার সিস্টেমের আওতায় আনার টার্গেট নিয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষের উপকারে এবং সেচ প্রজেক্টের খরচ কমাতে সব ধরনের পাওয়ার পাম্প ও টিউবওয়েলকে সোলার সিস্টেমে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাকিস্তানের সৌর বিপ্লব: ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ

অনুষ্ঠানে ‘পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের গণজোয়ার: এর পরে কী এবং কারা অনুসরণ করছে?’ শীর্ষক উপস্থাপনা করেন পাকিস্তানের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সংস্থা ‘রিনিউয়েবলস ফার্স্ট’-এর প্রধান কর্মসূচি ও উদ্যোগ বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ বাসিত গৌরী। তিনি বলেন, পাকিস্তানের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে, যা মূলত জাতীয় গ্রিডের বাইরে নিজস্ব উদ্যোগে হয়েছে। শহর ও গ্রামে—বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় আবাসিক, শিল্প ও কৃষি খাতে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।

বাসিত গৌরী জানান, দেশটির এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছে অতিরিক্ত বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও সরকারি সহযোগিতা। পাকিস্তানে এই খাতে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে, যা আইএমএফের ঋণের প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশের সঙ্গে বড় পার্থক্য হলো এই টাকার বেশির ভাগই ব্যাংক থেকে আসেনি, পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে (সেলফ ফিন্যান্স) এই বিনিয়োগ করেছেন। এর ফলে সেখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

বাংলাদেশের নেট মিটারিংয়ে ৩০০% প্রবৃদ্ধি

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদ ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের পরিবর্তন: জাতীয় গ্রিডের বাইরে থেকে গ্রিডের ভেতরে, পারিবারিক সোলার থেকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ’ শীর্ষক উপস্থাপনা করেন। তিনি বলেন, গত ১ থেকে ২ বছরে দেশে ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থায় ৩০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পরিমাণের দিক থেকে ছোট হলেও অত্যন্ত নীরবে এটি শিল্পকারখানা ও আবাসিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে পরিবহন খাতেও এটি আসবে এবং জাতীয় তথ্যে এর প্রতিফলন ঘটবে।

আতিকুজ্জামান বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় পার্থক্য হলো অর্থায়নের মানসিকতায়। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে সোলার করার আগ্রহ কম। আমরা সব সময় ব্যাংক নির্ভর, কিন্তু পাকিস্তানে এটি মূলত নিজস্ব অর্থায়নে হয়েছে, যা থেকে আমাদের শেখার আছে।’

পাকিস্তান থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব জ্বালানির পথে বাংলাদেশকে আরও অনেক দূর যেতে হবে। এই বিষয়ে পাকিস্তান কীভাবে সংকট কাটিয়ে সফল হলো, তা থেকে আমাদের শেখার আছে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল হওয়া ৩১টি সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প পুনরায় বিবেচনা করছে বর্তমান সরকার। এই উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই প্রকল্পগুলো চালু হলে দেশ অনেক সৌরবিদ্যুৎ পাবে।

৫০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্ত করার লক্ষ্য

অনুষ্ঠানে রিনিউয়েবল এনার্জি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার জানান, আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

বাস্তবমুখী পলিসির প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম কম। তাই গ্রাহক সস্তায় বিদ্যুৎ পাওয়ায় সোলার পদ্ধতিতে আগ্রহী হচ্ছে না। পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে সূর্যের আলো প্রায় ৫০ শতাংশ কম থাকায় এখানে সোলার উৎপাদন খরচ বেশি হবে। বর্তমানে বিপিডিবি বিপুল ঋণের মুখে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু অন্যের সাফল্য দেখে ঝাঁপ না দিয়ে বাস্তবমুখী পলিসি ও বিদ্যুতের দামের যৌক্তিকীকরণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, দেশে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিবছর প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মূল কারণ। সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির ওপর থেকে সবার জন্য শুল্ক ও ট্যাক্স পুরোপুরি প্রত্যাহার করলে মানুষ নিজ উদ্যোগেই সোলার ব্যবহারে আগ্রহী হবে। গ্রিডের ক্ষতি না করেই ২০ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব, যা আমদানিনির্ভরতা কমাবে।

শুল্ক বৈষম্য দূর করতে কমিটি গঠন

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সদস্য আশরাফুল আলম জানান, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানির ওপর শুল্ক বৈষম্য দূর করতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। বর্তমানে ব্যাটারিতে শুল্ক ৬২ থেকে ৬৭ শতাংশ এবং সাধারণ আমদানিকারকদের জন্য সোলার প্যানেলে ২৯ শতাংশ, যা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। নতুন ট্যারিফ আগামী মাসেই প্রজ্ঞাপন (এসআরও) আকারে আসতে পারে।

উন্মুক্ত আলোচনায় রাজস্ব বৈষম্য দূর করার দাবি

অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে বিভিন্ন উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা বলেন, জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির রাজস্ব বৈষম্যের পাশাপাশি খোদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধার মধ্যেও এখনো বৈষম্য রয়ে গেছে। তাই সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এর পুরো সুফল এখনো মিলছে না। তারা দাবি করেন, বাজেট পাসের আগেই এই রাজস্ব বৈষম্য দূর করতে হবে। সর্বস্তরের ব্যবহারকারীদের সমান সুবিধা দিতে সোলারসহ সব ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানিসামগ্রী আমদানিতে শূন্য শুল্ক–সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান তারা।