কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বিদ্যুৎ লাইন বিধ্বস্ত, কিশোরগঞ্জে টানা তিন দিন অন্ধকার
বাংলা নববর্ষের প্রথম রাতের প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড় কিশোরগঞ্জ জেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের লাইনের ওপর গাছপালা পড়ে অসংখ্য স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যাওয়ায় টানা ৭২ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদ। এই দীর্ঘ সময়ব্যাপী বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা জনজীবনে নেমে এনেছে নজিরবিহীন দুর্ভোগ, যেখানে পানির তীব্র সংকট থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঝড়ের প্রভাবে লাইন ও খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত
জানা গেছে, পহেলা বৈশাখের রাতে বয়ে যাওয়া ঝড়ে পল্লী বিদ্যুতের লাইনের ওপর গাছ পড়ে অসংখ্য স্থানে তার ছিঁড়ে যায়। কোথাও কোথাও লাইনের ওপর ভেঙে পড়েছে গাছগাছালি, আবার কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। এমনকি পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ও ঝড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এই ব্যাপক ক্ষতির কারণে তিন দিন ধরে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে, যা স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
একাধিক উপজেলার গ্রাহকরা সংকটে
কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাভুক্ত মোট ১১টি উপজেলার গ্রাহকরা এই বিদ্যুৎহীনতার সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে কিশোরগঞ্জ সদর, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, নিকলী, বাজিতপুর, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম। এই বিশাল এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্থানীয়রা তীব্র গরম ও অন্ধকারের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।
জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ
বিদ্যুৎহীনতার এই দীর্ঘ সময়ে জনজীবনে নেমে এসেছে বহুমুখী সমস্যা। ফ্রিজে রাখা পচনশীল খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট। চার্জের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে নিত্য ব্যবহার্য মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী। দিনের বেলা তীব্র গরমের জ্বালায় ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে, অন্ধকারের কারণে বাড়ছে চুরির ঘটনা। গ্রাহকরা প্রকাশ্যে বলছেন যে ঝড়ের তাণ্ডবের অজুহাতে এত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকা মেনে নেওয়া যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য
সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের ভাস্করখিলা গ্রামের আজিজুল ইসলাম, আব্দুল মালেক ও বকুল মিয়া জানান, "আমাদের এলাকায় তিন দিন যাবত কোনো বিদ্যুৎ নেই। যে কারণে তীব্র খাবার পানির সংকটে পড়েছি। পাশাপাশি কুরবানির ঈদে বিক্রির জন্য যে গরু লালন-পালন করছি তাতে তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। গরুকে গোসল করাতে পারছি না। একেকটা গরুর দাম তিন-চার লাখ টাকা। এ সমস্যা থেকে মুক্তি চাই।"
একই গ্রামের মোহাম্মদ ফায়জুল ইসলাম বলেন, "আমার ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে পড়াশোনায় ক্ষতি হচ্ছে।" তাড়াইল উপজেলার সদর ইউনিয়নের মোহাম্মদ আলী ও দীন ইসলাম যোগ করেন, "লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের ব্যবসায় লোকসান গুণতে হচ্ছে।"
সদর উপজেলার লতিবাবাদ ইউনিয়নের অটোরিকশাচালক হান্নান মিয়া বলেন, "অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় অটোরিকশা চার্জ দিতে পারছি না। যে কারণে গাড়ি বাসায় পড়ে আছে। ইনকাম নেই। ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছি।"
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, "পহেলা বৈশাখের রাতে হওয়া ঝড়ে লাইনের ওপর গাছপালা পড়ে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ও ঝড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে সংস্কারকাজ পুরোদমে চলছে এবং আজকের মধ্যেই সব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হবে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতের কাজ চলছে এবং আশা করা হচ্ছে যে শীঘ্রই সমস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। তবে এই দীর্ঘ সময়ব্যাপী বিদ্যুৎহীনতা স্থানীয় অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য আরও কার্যকরী পদক্ষেপের প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



