বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: অতীত থেকে বর্তমান, এলএনজি নির্ভরতা ও টেকসই সমাধানের পথ
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: এলএনজি নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ

জ্বালানি সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকট মূলত তেলের সরবরাহে বিঘ্নের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিসর ও সিরিয়ার ইয়োম কুপ্পির যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ অনুভব করে। এই সময়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, বিশ্বের বহু দেশ বিকল্প তেলের উৎস সন্ধান শুরু করে।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে তেল অনুসন্ধান শুরু করে, কিন্তু তারা আবিষ্কার করে প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। আশি ও নব্বইয়ের দশকজুড়ে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। একই সময়ে ব্রিটেন ও ইউরোপেও গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, এবং যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প জ্বালানি হিসেবে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে থাকে।

এলএনজির উত্থান ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব

ইউরোপ ধীরে ধীরে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্যাস বাজার সরিয়ে আনা কঠিন করে তোলে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রকে গ্যাস রপ্তানি করতে হলে তা তরল করে (এলএনজি) আটলান্টিক পাড়ি দিতে হয়, যার খরচ পাইপলাইনের গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এলএনজির জন্য বিশেষ প্রযুক্তি ও বড় অবকাঠামো প্রয়োজন। গ্যাসকে প্রথমে তরল করতে হয়, তারপর কার্গো জাহাজে পাঠানো হয়, এবং গন্তব্যে পৌঁছে আবার গ্যাসে রূপান্তরিত করে পাইপলাইনে মিশিয়ে বিতরণ করতে হয়। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এলএনজিকে কৌশলগত জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করে, দামের দিকে না তাকিয়ে।

জাপানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করে। জাপানের জ্বালানির প্রয়োজন ছিল, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল এলএনজি প্রযুক্তি উন্নয়নে একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র। ফলে জাপান এলএনজি প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে এলএনজি অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশের জ্বালানি কৌশল ও বর্তমান সংকট

২০১০ সাল থেকে জাপানের সহায়তায় প্রণীত পাওয়ার ‘মাস্টারপ্ল্যান’-এর বিভিন্ন সংস্করণে এলএনজি ও কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর কথা জোর দিয়ে বলা হয়। সেই পথ অনুসরণ করেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় এলএনজি–নির্ভরতা বাড়াতে থাকে। পাশাপাশি, ২০১০-এর দশকজুড়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা কয়লার ওপর ভর করে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ব আবার নতুন করে জ্বালানিসংকটের মুখোমুখি। কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ, এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ—সব মিলিয়ে গভীর জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থানে আছে, কারণ এলএনজির দাম বাড়ায় তারা লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো চরম সংকটে পড়েছে।

একটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর বাংলাদেশকে জ্বালানি কিনতে ৪০ শতাংশ বেশি খরচ করতে হবে। বাংলাদেশ এলএনজি-নির্ভর হয়েছে, কারণ গত কয়েক দশকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেয়নি। এখন দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনাল আছে, এবং আরও দুটি টার্মিনাল নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

টেকসই সমাধানের দিকে অগ্রসর

বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো সমুদ্রবক্ষে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্যাস উত্তোলন। তবে এর ফল পেতে সময় লাগবে। দ্রুত সমাধান হিসেবে এখনই বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়ন জরুরি। এর মধ্যে আছে জমিভিত্তিক বড় সৌর প্রকল্প, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, এবং সেচের জন্য সৌর পাম্প।

ভিয়েতনামের উদাহরণ থেকে দেখা যায়, ২০১৮ সালে শূন্য থেকে শুরু করে তারা ২০২০ সালের শেষ নাগাদ ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌর সক্ষমতা তৈরি করেছে। এই সফলতার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল সরকারের হস্তক্ষেপ ও ‘ফিড–ইন ট্যারিফ’ প্রণোদনা, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদকদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্রিডে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট মূল্য নিশ্চয়তা দেয়।

সংকট শুরুর পর দেখা যাচ্ছে, যে দেশ যত বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে, তারা তত বেশি নিজেদের অর্থ সাশ্রয় করতে পারছে। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান সাশ্রয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যেখানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে পাকিস্তান ১২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে।

উপসংহার

কয়লা উত্তোলন করে দেশের মানুষের জীবন–জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করা, পরিবেশ দূষিত করা, এবং সামাজিক নিরাপত্তা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করা টেকসই সমাধান নয়। অন্যদিকে, এলএনজি কিনতে বছরে যে ছয় বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেই অর্থ দিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্যাস উত্তোলনে বিনিয়োগ করলে গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা বাড়ত।

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কৌশল নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। টেকসই ভবিষ্যতের জন্য আমদানি–নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করা এখন সময়ের দাবি।