জ্বালানি সংকটে তৃষ্ণার্ত মোটরসাইকেল চালকদের কাজল হোসেনের পানি বিতরণ
জ্বালানি সংকটে তৃষ্ণার্ত চালকদের পানি বিতরণ

জ্বালানি সংকটে তৃষ্ণার্ত মোটরসাইকেল চালকদের পানি বিতরণ করছেন যুবক কাজল

চৈত্রের কাঠফাটা রোদে পুড়ছে দিনাজপুরের বিরামপুর পৌরশহর। জ্বালানি তেলের সংকটে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল চালকদের মাঝে তৃষ্ণা নিবারণের এক অনন্য দৃশ্য দেখা গেছে। স্থানীয় যুবক কাজল হোসেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই তৃষ্ণার্ত মানুষদের বিনামূল্যে ঠাণ্ডা পানি পান করাচ্ছেন, যা এলাকায় প্রশংসা কুড়িয়েছে।

দীর্ঘ অপেক্ষা ও তীব্র তৃষ্ণার মাঝে মানবিকতা

বিরামপুরের কলাবাগান এলাকায় অবস্থিত মেসার্স সরকার ফিলিং স্টেশনের সামনে বুধবার দুপুরে চোখে পড়ে ভিন্ন এক চিত্র। দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে এই পাম্পে জ্বালানি তেল কিনতে শত শত মোটরসাইকেল চালক দীর্ঘ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন। তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরমে অনেকের গাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, কেউ কেউ হেলমেট খুলে ছাতা ব্যবহার করছেন। এই দৃশ্য দেখে ইসলামপাড়া মহল্লার বাসিন্দা কাজল হোসেন (২৫) নিজ উদ্যোগে নলকূপ থেকে আনা জগভর্তি ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসে গ্লাসে করে সেবা দিচ্ছেন।

তিনি প্রত্যেকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘ঠাণ্ডা পানি লাগবে নাকি’ এবং সম্মতি পেলেই তা পরিবেশন করছেন। পেশায় মাংস ব্যবসায়ী এই যুবক প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের সন্তান। তাঁর এই মহৎ উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংকটের পটভূমি ও চালকদের ভোগান্তি

সরেজমিনে জানা যায়, সারা দেশের মতো বিরামপুরের তিনটি ফিলিং স্টেশনেও জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। এই সংকটের কারণে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করা হচ্ছে, যার ফলে প্রতিদিন ভোর থেকেই মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অনেকেই তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন, রোদে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে। আশপাশে পানি পান করার সুযোগ সীমিত হওয়ায় এই সমস্যা আরও তীব্র হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুকুন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মোটরসাইকেল চালক একরামুল হক বলেন, ‘সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি, রোদে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কাজলের এই উদ্যোগ খুবই ভালো লাগছে।’

কাজল হোসেনের অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কাজল হোসেন তাঁর উদ্যোগের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘পাম্পে তেল নিতে আসা মানুষগুলো রোদে পুড়ছে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাঁরা তৃষ্ণার্ত হচ্ছেন, কিন্তু আশপাশে পানি পান করার সুযোগ নেই। তাঁদের কষ্ট দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছে, তাই ঠাণ্ডা পানি পান করাচ্ছি। যত দিন বিরামপুরে তেলসংকট থাকবে এবং ক্রেতারা এভাবে রোদে পুড়বেন, তত দিন আমি এই সেবা চালিয়ে যাব।’

তাঁর এই মানবিক প্রচেষ্টা এলাকাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন এবং কাজল হোসেনকে সাধুবাদ দিচ্ছেন।

সরকারি উদ্যোগের অভাব ও সম্ভাবনা

ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৃষ্ণার্তদের জন্য পানি সরবরাহে কোনো সরকারি উদ্যোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নে বিরামপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল বলেন, ‘পাম্পে তেল কিনতে আসা মানুষদের দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে কষ্ট করতে দেখে খুব খারাপ লাগছে। তবে উপজেলা সমাজসেবা দপ্তরের কাছে এই কাজের জন্য বরাদ্দ নেই।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে উপজেলা সমাজসেবা দপ্তরের আওতাধীন নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা ক্লাবগুলোর মাধ্যমে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য সুপেয় পানি পান করানোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ উপকৃত হবেন।

জ্বালানি তেল সংকটের এই কঠিন সময়ে কাজল হোসেনের মতো ব্যক্তিদের মানবিক উদ্যোগ সামাজিক সংহতি ও সহমর্মিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। তাঁর এই প্রচেষ্টা শুধু তৃষ্ণা নিবারণই নয়, বরং মানবিকতার এক অনন্য নজির হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।