মাগুরায় জ্বালানি সংকটে নারীরা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, কৃষিকাজ রক্ষায় তেল সংগ্রহে নামছেন
মাগুরা জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তেল মিলছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিকাজ ও যানবাহন চলাচলে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায় পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সহযোগিতা করতে নারীরাও জ্বালানি তেল সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, যা একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য হিসেবে স্থানীয়দের নজর কেড়েছে।
কৃষক ও নারীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) শহরের ভিটাসাইর এলাকায় অবস্থিত মা ফাতেমা ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, কৃষক, যানবাহন চালক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের পাশাপাশি নারীরাও তেল সংগ্রহে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। মাগুরায় মোট ১৪টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। সদর উপজেলার পাম্পগুলোতে কৃষকরা সেচযন্ত্রে ব্যবহারের জন্য ডিজেল পেতে পাত্র হাতে ভিড় জমাচ্ছেন। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, চলমান ধান আবাদের জন্য এখনও তাদের অনেক ডিজেল প্রয়োজন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, যদি কোনো কারণে তেল আমদানি বন্ধ হয়, তাহলে আবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, নারীরা সাধারণত কেনাকাটায় সক্রিয় হলেও লাইনে দাঁড়িয়ে পাম্প থেকে জ্বালানি তেল কিনতে অভ্যস্ত নন। কিন্তু, বর্তমান সংকটে জ্বালানি সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যা দৈনন্দিন কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ এই সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যাতে নিজেদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য নারীরা ড্রাম হাতে পাম্পগুলোতে জড়ো হচ্ছেন।
নারীদের বক্তব্য: স্বামীর কৃষিকাজ রক্ষায় তেল সংগ্রহ
সদর উপজেলার কাটাখালি এলাকার আশা বেগমকে কোলে সন্তান নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, "আমার স্বামী কৃষিকাজ করেন। তেল নিতে অনেক সময় লাগে, কখনো পুরো দিনও চলে যায়। এতে কৃষিকাজে ব্যাঘাত ঘটে। তাই স্বামীর কাজে সহযোগিতা করতে নিজেই তেল নিতে এসেছি।" একই দৃশ্য দেখা গেছে সুফিয়া খাতুনের ক্ষেত্রেও। তিনি বলেন, "দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে আমার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে ঠিকভাবে কৃষিকাজ করতে পারেন না। তাই স্বামীর সহযোগিতা করতে তেল সংগ্রহ করতে আসছি।"
জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ: ট্যাগ অফিসার নিয়োগ
এদিকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পাম্পে একজন করে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাহামুদ বলেন, "জেলায় জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। চলমান যুদ্ধে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় যানবাহন চালক এবং কৃষকদের অতি ব্যস্ততা রয়েছে। সুষ্ঠুভাবে সবাই যাতে জ্বালানি তেল পায়, সে জন্য প্রতিটি পাম্পে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মনিটরিং করছেন।" অফিসার নিয়োগের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন বলে জানান তিনি। সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে জ্বালানি তেল সংগ্রহের আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
এ বিষয়ে ভিটাসাইর এলাকার মা ফাতেমা ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার ও সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, "পাম্পে ৫-৬ জন নারী তেল নিতে এসেছিলেন। তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় না রেখে পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নারীদের এই উদ্যোগ কৃষিকাজ ও পরিবারের কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মাগুরায় জ্বালানি সংকটের এই পরিস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তারা বলছেন, দ্রুত সমাধান না হলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আরও কার্যকরী উদ্যোগ প্রয়োজন।



