মাত্র ১৬ বছর বয়সে নার্গিসের সঙ্গে পরিচয় হয় ২২ বছর বয়সী এক তরুণ চলচ্চিত্রকারের। তিনি রাজ কাপুর। তখন নিজের নতুন স্টুডিও আরকে ফিল্মসকে দাঁড় করানোর সংগ্রামে ব্যস্ত ছিলেন রাজ। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যদিও রাজ তখন বিবাহিত এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন কৃষ্ণা রাজ কাপুর। সেই সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকে ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নার্গিস বুঝতে পারেন, তিনি এমন এক সম্পর্কে আটকে আছেন, যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর অভিনয়জীবনেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। বলিউডের অন্যান্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নার্গিসকে নেওয়ার আগে রাজ কাপুরের মতামতের দিকে তাকিয়ে থাকত। অন্যদিকে নার্গিস ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন যে রাজ কখনোই তাঁর স্ত্রীকে ছেড়ে যাবেন না। এ উপলব্ধি নার্গিসকে ভীষণ কষ্ট দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক সে সময়ই মেহবুব খানের 'মাদার ইন্ডিয়া' ছবির প্রস্তাব আসে। ছবিটি শুধু তাঁর ক্যারিয়ারের মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়নি, এনে দিয়েছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ—সুনীল দত্তকে।
আগুনের ঘটনার পর বদলে যায় জীবন
'মাদার ইন্ডিয়া' ছবিতে সুনীল দত্ত অভিনয় করছিলেন নার্গিসের ছেলের চরিত্রে। শুটিংয়ের সময় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নার্গিসকে উদ্ধার করেন সুনীল। আগুনে সুনীলের আঘাত ছিল আরও গুরুতর। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা সুনীলের পাশে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন নার্গিস। সে সময়ের যত্ন, মমতা আর আন্তরিকতাই ধীরে ধীরে প্রেমে রূপ নেয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুজন বুঝে যান, তাঁরা একসঙ্গে জীবন কাটাতে চান। তবে বিষয়টি গোপন রাখতে হয়েছিল। কারণ, তখনো 'মাদার ইন্ডিয়া' মুক্তি পায়নি। ছবিতে মা-ছেলের চরিত্রে অভিনয় করা দুই তারকার প্রেমের খবর প্রকাশ পেলে ছবির ক্ষতি হতে পারত। আরেকটি বড় কারণ ছিল রাজ কাপুরের প্রভাব। বলিউডে তখন তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি, আর সুনীল ছিলেন একেবারে নতুন। তাই একই শহরে থেকেও তাঁরা দেখা করার বদলে একে অপরকে চিঠি লিখতেন।
বিয়ের পর ভেঙে পড়েছিলেন রাজ কাপুর
১৯৫৮ সালে নার্গিস ও সুনীল দত্ত বিয়ে করেন। এই বিয়ে রাজ কাপুরের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। মধু জৈনর বই 'দ্য কাপুরস: দ্য ফার্স্ট ফ্যামিলি অব ইন্ডিয়ান সিনেমা' অনুযায়ী, তিনি এটিকে 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে দেখেছিলেন। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজ কাপুর নাকি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে নার্গিস অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেন। তিনি নিজেকে সিগারেটের আগুন দিয়ে পোড়াতেন, যেন নিশ্চিত হতে পারেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন না। রাজের স্ত্রী কৃষ্ণা কাপুর পরে সাংবাদিক বান্নি রিউবেনকে বলেছিলেন, রাজ প্রায়ই রাতে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরতেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথটাবে বসে কাঁদতেন।
'আমি নরকে ছিলাম'
কিশ্বর দেশাইয়ের বই 'ডার্লিংজি: দ্য ট্রু লাভ স্টোরি অব নার্গিস'-এ সংরক্ষিত আছে নার্গিস ও সুনীলের বহু ব্যক্তিগত চিঠি। সেই চিঠিগুলোতেই উঠে এসেছে নার্গিসের মনের গভীর ক্ষত। সুনীলের কাছে নার্গিস অকপটে লিখেছিলেন, রাজ কাপুরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শেষ সময়টা ছিল 'রেজারের ধার ধরে হাঁটার মতো'। তিনি মরিয়া হয়ে সম্পর্কটিকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন, সব চেষ্টা বৃথা। এক চিঠিতে নার্গিস লিখেছিলেন, 'এটা ছিল এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। আমি নরকে ছিলাম।' আরও লিখেছিলেন, 'আমার ভালোবাসা ছিল এক সুন্দর গাছের মতো, যে ফুল ফোটাতে চেয়েছিল। কিন্তু মাটিতে ছিল বিষ।' রাজ কাপুর সম্পর্কে নার্গিসের সবচেয়ে কঠিন মন্তব্য ছিল, 'তিনি আমাকে এমন অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে আমি নিজের কাছেই ঘৃণ্য হয়ে উঠেছিলাম।' নার্গিসের মতে, তিনি এত দিন যাঁকে প্রেম ভেবেছিলেন, তা আসলে একতরফা আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের শোষণ ছিল। সুনীলকে লেখা আরেক চিঠিতে তিনি জানান, জীবনে প্রথমবার সত্যিকারের ভালোবাসার স্বাদ পেয়েছেন।
সুনীলের মধ্যে খুঁজে পেলেন নিরাপত্তা
সুনীল দত্ত তখনো প্রতিষ্ঠিত তারকা নন। কিন্তু তাঁর সততা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও নির্ভরযোগ্যতা নার্গিসকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। সুনীলের এক বোন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে নার্গিস নিজের কাজ ফেলে তাঁর সেবা করেছিলেন। পরে সুনীল বলেছিলেন, 'আমি তখনই বুঝেছিলাম, এই মানুষটির সঙ্গেই জীবন কাটাতে চাই। তিনি শুধু আমার নন, আমার পরিবারেরও মানুষ হয়ে উঠতে পারেন।' নার্গিস আর কখনো রাজ কাপুরের দিকে ফিরে তাকাননি। সুনীল দত্তর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। ১৯৮১ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আগপর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গেই ছিলেন। বলিউডের ইতিহাসে রাজ কাপুর ও নার্গিসের প্রেম আজও কিংবদন্তি। কিন্তু নার্গিসের নিজের ভাষায়, সেই সম্পর্কের শেষ অধ্যায় ছিল 'এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন'। আর সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এমন একজন মানুষকে, যাঁর কাছে তিনি প্রথমবারের মতো নিজেকে নিরাপদ, সম্মানিত এবং সত্যিকার অর্থে ভালোবাসার যোগ্য বলে মনে করেছিলেন।
রাশিয়ায় থেকেও পিছু ছাড়েননি রাজ
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও রাজ কাপুর নার্গিসকে ভুলতে পারেননি। সে সময় নার্গিস সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন 'পরদেশি' ছবির শুটিং করতে। সেখানে থেকেও নার্গিস নিয়মিত সুনীলকে চিঠি লিখতেন। সেই চিঠিতে বারবার উঠে আসত রাজ কাপুরের প্রসঙ্গ। তিনি লিখেছিলেন, চারপাশের সবাই তাঁকে রাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করছে, যা তাঁকে ক্লান্ত করে তুলছে। এমনকি রাজ কাপুরও তাঁকে টেলিগ্রাম পাঠাতেন। নার্গিস সুনীলকে আশ্বস্ত করে লিখেছিলেন, 'রাজ এখন অতীত। আমি তাঁকে নিয়ে আর ভাবি না।'
বার্লিন বিমানবন্দরে সেই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ
রাশিয়া থেকে ফেরার পথে বার্লিনে নার্গিসের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় রাজ কাপুরের। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই তিনি সেখানে উপস্থিত হন। নার্গিস পরে সুনীলকে লিখেছিলেন, রাজ সেদিন 'একজন নিখুঁত ভদ্রলোকের মতো' আচরণ করেছিলেন। দুজন একসঙ্গে দুপুরের খাবার খান, রাতের খাবারও খান। রাজ জানতে চেয়েছিলেন, তাঁদের বিচ্ছেদের প্রকৃত কারণ কী। সেই প্রথমবারের মতো নার্গিস তাঁকে সম্পূর্ণ সত্য কথা বলেন। নার্গিস লিখেছিলেন, 'আমরা সেদিন শুধু বন্ধু বা সহকর্মীর মতো কথা বলেছি, এর বেশি কিছু নয়।' সাক্ষাৎ শেষে তাঁর মনে হয়েছিল, বুকের ওপর জমে থাকা বিশাল এক বোঝা নেমে গেছে।
অর্থ, জমি, সিনেমা—সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন নার্গিস
বার্লিনে সেই সাক্ষাতের সময় রাজ কাপুর তাঁকে নানা প্রস্তাব দেন। তিনি নার্গিসকে বকেয়া অর্থ দিতে চেয়েছিলেন। নার্গিস তখন আর্থিকভাবে চাপে ছিলেন, তবু সেই অর্থ নিতে অস্বীকার করেন। রাজ তাঁদের জন্য কেনা জমির কথাও তোলেন, যেখানে একসময় তাঁরা বাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। নার্গিস সেটিও প্রত্যাখ্যান করেন। রাজ ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রের গল্প শোনান এবং জানতে চান, তিনি কি আবার তাঁর সঙ্গে কাজ করবেন? উত্তর ছিল স্পষ্ট—না। নার্গিস বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর জীবনে রাজ কাপুর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে।



