বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের বাজেটে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকলেও দেশে এখনও ভোক্তা পর্যায়ে দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আসন্ন জাতীয় বাজেটে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত আরও তীব্র হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতেও পারে।
সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ১০ সেন্টে, যা আগের দিনের তুলনায় ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম বেড়ে হয় ১০২ ডলার ৩০ সেন্ট, যা ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব
গবেষণা বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লেই বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বেড়ে যায়। আর যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের বেশি থাকে— তাহলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ ধরনের প্রাক্কলন তুলে ধরেছে। সংস্থাটির প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘‘বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় ও বাজেটের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।’’
দাম না বাড়ালে বাড়বে ভর্তুকি
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও সরকার আপাতত দেশে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এপ্রিল মাসেও ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের বর্তমান দাম বহাল থাকবে।
বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। কিন্তু আমদানি ও সরবরাহ ব্যয় বিবেচনায় এর প্রকৃত খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯৮ টাকা। অর্থাৎ প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৯৮ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। একইভাবে অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও এর আমদানি ব্যয় পড়ছে ১৫০ টাকার বেশি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হলে বর্তমানে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২০০ টাকার কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু দাম না বাড়ানোর ফলে শুধু এক মাসেই সরকারকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু) সংসদে বলেন, ‘‘গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম প্রায় ৯৮ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে এবং তা বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।’’
বাজেটে ভর্তুকির চাপ কতটা বাড়তে পারে
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে শুধু চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসেই অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে। এই অর্থ জোগাড় করতে সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাজেট সহায়তা ও ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী— প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে বছরে বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘ সময় দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। দেশীয় মুদ্রায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়— প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগ সূত্র বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে নতুন করে ব্যয় যোগ হলে সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ খাতেও বাড়ছে ভর্তুকি
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ খাতেও। বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনও ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও আমদানিকৃত এলএনজি’র ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎ বিভাগ ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও নতুন প্রস্তাব অনুমোদিত হলে মাসিক ভর্তুকি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রস্তাব অনুমোদিত হলে পুরো অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেছেন, ‘‘গত ১৫ বছরে শুধু বিদ্যুৎ খাতে যে ব্যাপক লুণ্ঠন ও অপচয় হয়েছে, তা বন্ধ করতে পারলেই খাতটির অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব।’’ তিনি বলেন, ‘‘অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে গিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ছে। এর ফলে বাজেটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করার সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।’’
বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভে চাপ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে শুধু বাজেট নয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে প্রতি মাসে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ৭৬০ থেকে ৮৩০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় বাড়ছে।
এ কারণে সরকার আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও এআইআইবি থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইএমএফ থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়া এডিবির কাছ থেকে অতিরিক্ত ২৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
শিল্প খাতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।
বাংলাদেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশের বেশি এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত এবং এই খাত দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে— যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তার ওপর প্রভাব ফেলবে।
বিকল্প জ্বালানিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ
গবেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একদিকে সংকট হলেও অন্যদিকে এটি একটি সুযোগও তৈরি করেছে। এখনই যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষতার ওপর বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে শিল্প এলাকায় রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানো গেলে অনেক ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে ভবিষ্যতেও বাজেটে বড় অঙ্কের ভর্তুকির চাপ বহন করতে হবে।
সামনে কঠিন বাজেট সমীকরণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার সামনে দুটি কঠিন বিকল্পের মুখে পড়তে পারে— একদিকে জ্বালানির দাম বাড়ানো, অপরদিকে বাজেট থেকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া। উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া এই চাপ থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে আগামী বাজেটে জ্বালানি ভর্তুকির বোঝা ঠিক কতটা বাড়বে, এবং সেই চাপ সামাল দিতে সরকার কী কৌশল নেবে— সেই সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



