মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে সংকট ও বিকল্প উৎসের খোঁজ
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে সংকট

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে সংকট

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার বিকল্প উৎস থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে শুরুতে অনেক সরবরাহকারী আগ্রহ দেখালেও এখন পর্যন্ত খুব কম প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই ধরনের অনিশ্চয়তা সরকারি ও বেসরকারি খাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। ফলে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা কাটছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা

বাংলাদেশে তেল ও গ্যাস আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা বেশি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই তেল ও গ্যাস খাতে বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়। তবে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অন্য দেশগুলোও একই চেষ্টা চালানোয় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও ইরান জানিয়েছে, বাংলাদেশের জাহাজ জ্বালানি নিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি স্থাপনায় একের পর এক হামলার কারণে কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে প্রভাব

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে পড়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়েই জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, যার চাপ পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলামের মতে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৬৫ শতাংশ এবং এলপিজির ৫১ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের কৌশল ও চ্যালেঞ্জ

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, সরকার এখন সরবরাহ ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ জন্য প্রচলিত উৎসের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও তেল ও গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যাতে যেকোনোভাবে সরবরাহে ঘাটতি না পড়ে। অর্থাৎ বাজারমূল্য বাড়লেও জ্বালানি সংগ্রহ অব্যাহত রাখার কৌশল নিয়েছে সরকার। তবে দেশে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ব্যয় বাড়লেও আপাতত ডিজেল, অকটেন কিংবা পেট্রলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই।

জ্বালানি তেলে নিশ্চয়তা

দেশে জ্বালানি তেল আমদানির একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বর্তমান অস্থিরতায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবার সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে তেল আনার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এ জন্য বিভিন্ন দেশের অন্তত ১১টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এখন পর্যন্ত সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তেল নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

  • এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড: এক লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করবে, প্রতি ব্যারেলে ৩ ডলার ছাড় দেবে।
  • সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড: ২ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে, প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪০ ডলার ছাড় দিতে পারে।

এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও বিপিসি এখনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা পায়নি। বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, আগ্রহ অনেক প্রতিষ্ঠানই দেখাচ্ছে, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা কম।

এলপিজি ও এলএনজি আমদানিতে শঙ্কা

এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মার্চে কিছু এলপিজি আমদানি হয়েছে বটে, তবে এপ্রিলে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে। এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ মাসে কমিশন টনপ্রতি ১২০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে দাম নির্ধারণ করেছে, কিন্তু বিশ্ববাজারে এখন জাহাজভাড়া অনেক বেশি।

এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, চলতি মাসে আটটি এলএনজিবাহী জাহাজ এসেছে, আগামী মাসে মোট নয়টি জাহাজ আসবে। তবে কাতার ও ওমান থেকে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা চলছে। সম্ভাব্য উৎস হিসেবে অ্যাঙ্গোলা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিকল্প উৎসে যোগাযোগ বাড়ানো হলেও তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তেল–গ্যাসের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। তখন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এবং বিকল্প উৎসের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যাচাই করে চুক্তি করা উচিত।