রাজধানীতে তেল সংকট: বিজয় সরণিতে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন, ১০ ঘণ্টারও বেশি অপেক্ষা
রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকায় তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই সংকটে অনেকেই প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন, যা সময়ের অপচয় ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পলাশ রোজারিওর ১০ ঘণ্টার ভোগান্তি
সকাল ৬টায় তেল নেওয়ার আশায় বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন পলাশ রোজারিও। তিনি ভেবেছিলেন, এত সকালে হয়তো ভিড় কম থাকবে, কিন্তু বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তাঁর ধারণা পাল্টে যায়। সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, আর মোটরসাইকেলের লাইন এলেনবাড়ির বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। পলাশ লাইনে দাঁড়ানোর ১০-১৫ মিনিট পর জানতে পারেন, তেল নেই এবং সরবরাহ এলেই বিক্রি শুরু হবে।
ব্যবসার কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহার করা পলাশের তেল প্রায় শেষ হওয়ায় অপেক্ষা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। সকাল গড়িয়ে প্রায় ১০টা বাজে, চার ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। তিনি আবার পাম্পের কর্মীদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে চান, তেলের গাড়ি কবে আসবে? জবাবে বলা হয়, দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে তেল বিক্রি শুরু হতে পারে। ক্ষুধা ও ক্লান্তি বাড়তে থাকায় পলাশ সাময়িকভাবে লাইন ছেড়ে কাছের বাসায় গিয়ে নাশতা করে কিছুটা জিরিয়ে নেন।
সোয়া ১২টার দিকে আবার ফিরে এসে তিনি সেই একই লাইনে দাঁড়ান, কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। শেষে আড়াইটার দিকে ধীরে ধীরে সারি এগোতে শুরু করে। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে, প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা অপেক্ষার পর, পলাশ অবশেষে তেল পান। তিনি বলেন, ‘সকালে ভেবেছিলাম আধা ঘণ্টা, বেশি হলে এক ঘণ্টার মধ্যে তেল নিয়ে চলে যাব। কিন্তু পুরো একটা দিন লাইনে দাঁড়িয়ে কাটাতে হবে—এটা ভাবতেই পারিনি। এটা শুধু কষ্ট না, সময়ের অপচয়ও।’
রানা ইসলামের সোয়া আট ঘণ্টার অপেক্ষা
ওই একই পাম্পে আরেক চালক রানা ইসলাম সকাল ৮টার কিছু পরে তেল নেওয়ার আশায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি মহাখালী ডিওএইচএস এলাকার এক বাসিন্দার ব্যক্তিগত গাড়ির চালক। তখন ব্যক্তিগত গাড়ির সারির শেষ প্রান্ত ছিল মহাখালী উড়ালসড়ক থেকে নামার মুখে। রোদের মধ্যে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি বেলা সোয়া দুইটা পর্যন্ত, এরপর গাড়ি সামনের দিকে এগোনো শুরু করে।
বিকেল সোয়া চারটার দিকে তিন হাজার টাকার অকটেন নিতে সক্ষম হন রানা, সব মিলিয়ে তাঁর অপেক্ষা ছিল প্রায় সোয়া আট ঘণ্টা। তেল নেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘ভাই, সকাল থেকে কলা-রুটি খেয়ে আছি। খুব খিদে লাগছে। যা বলার তাড়াতাড়ি বলেন। এখন আগে মালিকের বাসায় গাড়ি রেখে তারপর বাসায় যেতে হবে।’
বিজয় সরণিতে ভিড়ের চিত্র
বিকেল পৌনে চারটার দিকে বিজয় সরণির ট্রাস্ট পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ব্যক্তিগত গাড়ির সারি শাহিনবাগ এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত, আর মোটরসাইকেলের সারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ওই সময় পাম্পে তেল কেনার সারিতে ২১৭টি ব্যক্তিগত যানবাহন এবং ১৭৮টি মোটরসাইকেল ছিল। রোদের মধ্যে মোটরসাইকেলচালকদের অনেকে ফুটপাতে গাছের ছায়ায়, ছাতা ধরে বা গায়ে কাপড় দিয়ে বসে ছিলেন।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের শিফট ইনচার্জ শহীদুল ইসলাম জানান, ‘সকালে পাম্পে অকটেন ছিল না। বৃহস্পতিবার রাতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তেলের গাড়ির পৌঁছায় আজ বেলা দুইটার দিকে। পরে সোয়া দুইটা থেকে বিক্রি শুরু করি।’ এ সময় ডিজেল বিক্রি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মিরপুরে কালশী থেকে ইসিবি চত্বর পর্যন্ত ভোগান্তি
মিরপুরের কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকে তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। জুমার নামাজের পর বিক্রি শুরু হলে সেখানেও ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। বেলা সোয়া তিনটার দিকে পাম্প থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ইসিবি চত্বর পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি ছড়িয়ে পড়েছিল।
সেখানে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মী সেলিম মিয়া দুপুর ১২টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু তিন ঘণ্টা পর বেলা ৩টায়ও তাঁর সামনে ছিল আরও অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল। তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম শুক্রবার বলে ভিড় একটু কম থাকবে। কিন্তু এসে দেখি পাম্পই বন্ধ। আরও কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, তারও কোনো ঠিক নেই। একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’ বেলা তিনটার দিকে পাম্পের বাইরের সড়কে দুই সারিতে ৩১৬টি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং আলাদা এক সারিতে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দেখা গেছে।
রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় তেল সংকট
নগরের বিভিন্ন এলাকায় তেলের সংকটের চিত্র ভিন্ন ভিন্ন ছিল। দুপুরে মেরাদিয়ার বনশ্রী ফিলিং স্টেশন, ডেমরার সিকদার ফিলিং স্টেশন, কাঁচপুরের এস ইন্টারন্যাশনাল ফিলিং স্টেশন এবং নীলক্ষেত মোড়ের সামদানি ফিলিং স্টেশন বন্ধ দেখা গেছে। তবে পরিবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ও মৌচাকের শামস ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি চলছিল, যদিও সেখানে দীর্ঘ সারি ছিল।
অন্যদিকে, বিকেলে তেজগাঁও শিল্প এলাকার সাউদার্ন, সততা ও সিটি ফিলিং স্টেশনেও তেল বিক্রি করতে দেখা গেছে। এসব পাম্পে যানবাহনের সারি থাকলেও তা তুলনামূলকভাবে কম দীর্ঘ ছিল, যা সংকটের আংশিক প্রতিফলন দেখায়।



