জ্বালানি সংকটে পাকিস্তানের সৌর বিপ্লব: বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেও পাকিস্তান ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্য আমদানি-নির্ভর জ্বালানিতে থাকা বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
সৌরবিদ্যুতে আমদানি সাশ্রয়ের অভূতপূর্ব সাফল্য
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ)-এর এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের বিস্তারের ফলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেল ও গ্যাস আমদানিতে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি সাশ্রয় হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অপরিবর্তিত থাকলে বছরের শেষে আরও প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশজুড়ে বাড়ি, খামার ও শিল্পকারখানায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল, যার ফলে তেল ও এলএনজির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এমনকি পাকিস্তান সরকার দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি পুনর্বিন্যাস এবং কিছু ক্ষেত্রে জ্বালানি রপ্তানির দিকেও অগ্রসর হচ্ছে।
সৌর বিপ্লবের পেছনের কারণসমূহ
রিনিউয়েবল ফাস্টের কর্মকর্তা রাবিয়া বাবর জানান, এই সৌর বিপ্লব মূলত সাধারণ মানুষের উদ্যোগে হয়েছে। অন্যদিকে সিআরইএ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা লরি মাইলিভির্তা বলেন, সৌরবিদ্যুৎ তেল ও গ্যাসের দামের অস্থিরতার বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘বীমা’ হিসেবে কাজ করছে।
নীতিগত সহায়তা ও বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিও এ অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সৌর প্যানেল আমদানিতে শুল্ক শূন্য ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্যানেলের দাম কমে যাওয়ায় এর ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ২০১৮ সালে যেখানে আমদানি ছিল ১ গিগাওয়াটের কম, ২০২৬ সালের শুরুতে তা বেড়ে ৫১ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে। একই সময়ে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটির তেল ও গ্যাস আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিকতা ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশেও একই ধরনের ঝুঁকি বিদ্যমান। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, যা বিশ্ববাজারের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক সময়ে সাশ্রয়ী দামে এলএনজি সংগ্রহেও জটিলতা দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশও আমদানি-নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারে। এর ফলে বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং পিক সময়ে লোডশেডিং কমানো সম্ভব হবে। পাকিস্তানের সাফল্য দেখিয়ে দেয় যে, সঠিক নীতিগত সহায়তা ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় আমদানি-নির্ভর দেশগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। এ পথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও এলএনজির বড় অংশ পরিবাহিত হয়, ফলে কোনো বিঘ্ন ঘটলে এশিয়ার দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা তাই বাংলাদেশের জন্য একটি সময়োপযোগী শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
