ঈদ সামনে রেখে জ্বালানি সংকট: রাজশাহী-সাতক্ষীরায় পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কৃষকরা চরম বিপাকে
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে সারা দেশে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে চালু থাকা রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহার করেছে সরকার। রবিবার (১৬ মার্চ) থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তের একদিন পেরিয়ে গেলেও রাজশাহী ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় এখনও স্বাভাবিক হয়নি জ্বালানি সরবরাহ। পাম্পে পাম্পে ঘুরেও তেল না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও কৃষকরা। বিশেষ করে সেচের জন্য ডিজেল না পেয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা।
রাজশাহীতে পাম্পে পাম্পে ঘুরেও তেল মিলছে না
এর আগে রবিবার (১৫ মার্চ) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব ফিলিং স্টেশনে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিক্রি চলবে। তবে কেউ এ সুযোগে জ্বালানি তেল মজুত করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু বাস্তবে রাজশাহীর অনেক ফিলিং স্টেশনে এখনও চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও তেল না পেয়ে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে। ফলে যেসব পাম্পে জ্বালানি রয়েছে সেখানে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। ধৈর্যচ্যুতি থেকে মাঝেমধ্যেই ঘটছে বাগবিতণ্ডা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
সোমবার পবা উপজেলার বায়া ভূগরোইল, নওহাটা বাজার, শাহ মখদুম বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা ও নগরীর গুল গফুর পেট্রল পাম্পসহ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, জ্বালানি নিতে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি। অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নওহাটা বাজার এলাকার রুচিতা ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক শাহিন মিয়া বলেন, ‘প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। বাইকে জ্বালানি না থাকলে অফিসের কাজে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই অপেক্ষা করছি। গত কয়েক দিনের তুলনায় লাইনের চাপ কিছুটা কমলেও এখনও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরেনি।’
পাম্প মালিকদের দাবি: অর্ধেক সরবরাহ
রাজশাহী জেলা পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৪৪টি পেট্রল পাম্প রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অধিকাংশ পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি মিলছে না। পাম্প মালিকদের দাবি, তাদের প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে অনেক পাম্পই অনাকাক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষকদের দুশ্চিন্তা: সেচের ডিজেল না পেলে ফসলের ক্ষতি
এদিকে, জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সেচ পাম্প চালাতে ডিজেল না পেয়ে অনেক জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া যাচ্ছে না। এতে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পবা উপজেলার চরখানপুর থেকে নগরীর গুল গফুর পেট্রল পাম্পে তেল নিতে আসা কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘ধানের জমিতে পাঁচ-ছয় দিন ধরে পানি দিতে পারিনি। পানির সংকটে জমির মাটি ফেটে যাচ্ছে। গত পাঁচ দিন ধরে পাম্পে ঘুরেও তেল পাইনি। পাম্পে এলে তারা বলছে, কাল ছাড়া তেল হবে না। পরদিন এলেও মেলেনি। এখন কী করবো বুঝতে পারছি না।’ তিনি দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। কৃষকদের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে চলতি মৌসুমে ধান উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সাতক্ষীরায় মধ্যরাত পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা
সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন। সরকারিভাবে তেলের কোনও ঘাটতি নেই বলা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল না পেয়ে সাধারণ মানুষ ও পরিবহন চালক এবং কৃষকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। সোমবার সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, তেল পাওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
জ্বালানির সংকট কতটা প্রকট, তা বোঝা যায় পাম্পের সামনে মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার দৃশ্য দেখে। গত ১৫ মার্চ রাতে পাম্পে তেল আসবে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে ইফতারের পর থেকেই শত শত মানুষ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ভিড় জমান। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে রাত ২টা থেকে আড়াইটার দিকে অনেকে তেল পেলেও আবার অনেকে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে খালি হাতেই ফিরেছেন।
লাশ নিয়ে ভ্যানও জ্বালানি সংকটে আটকে
ভিন্ন দৃশ্য ফুটে উঠেছে শহরের এ.বি. খান ফিলিং স্টেশনের সামনে। ফরহাদ হোসেন সুজন নামে এক ব্যক্তি একটি পোস্টের মাধ্যমে এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, রবিবার ময়নাতদন্তের জন্য আনা একটি লাশ নিয়ে ইঞ্জিনভ্যান সাতক্ষীরা থেকে প্রতাপনগরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় ভ্যানটিকে তেলের জন্য পাম্পের সামনে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। লাশের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়েও জ্বালানি সংকটের কারণে এমন বিলম্ব স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও কষ্টের সৃষ্টি করেছে।
ঈদের আগে মানুষের নাভিশ্বাস
সাতক্ষীরা শহরের কাছাকাছি অবস্থিত এ.বি. খান ফিলিং স্টেশন, আলিপুর ফিলিং স্টেশন, সোনালী ফিলিং স্টেশন, ইউরেনিয়াম ফিলিং স্টেশন ও সংগ্রাম ফিলিং স্টেশনের চিত্র প্রায় একই। সোমবার বেড়া আড়াইটার দিকে দেখা যায়, কোথাও তেল সরবরাহ একেবারেই বন্ধ, আবার কোথাও সীমিত আকারে তেল দেওয়া হচ্ছে। অনেক পাম্প কর্তৃপক্ষ তেল শেষ হওয়ার অজুহাতে গেট বন্ধ করে রেখেছেন। সামনে ঈদ, অথচ ঘরে ফেরার জ্বালানি না পেয়ে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। অনেকের মোটরসাইকেলে কর্মস্থলে ফেরার বা বাড়িতে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। চালকদের অভিযোগ, এই সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খোলা বাজারে বোতলে করে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছেন।
চালক ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রশাসনের কঠোর তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চড়া দামে বিক্রির প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব। পাশাপাশি ইরি মৌসুমে ধান চাষের সেচ কাজ অব্যাহত রাখার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি এবং জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা।
মোটরসাইকেলে তেল নিতে আসা আলতাফ হোসেন বাবু বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তেলের সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবতা হলো পাম্পগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং আতঙ্ক। মানুষ ভয় পাচ্ছে যে পরে আর তেল পাওয়া যাবে না, তাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে বাড়িতে মজুত করছে। মেঘনা কোম্পানির গাড়ি এসেছে, অথচ আমি নিজে প্রায় ৪০ মিনিট ধরে লাইনে দাঁড়িয়েও তেলের দেখা পাইনি।’
রায়হান সিদ্দিক নামে আরেকজন চালক বলেন, ‘সোমবার ইফতারের পর থেকেই পাম্পে তেলের জন্য লম্বা লাইন। লোকজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছে না। সরকার সংকট নেই বললেও আমাদের মতো ভুক্তভোগীরা তো তেল পাচ্ছি না। পাম্প মালিকরা কেন তেল দিচ্ছে না বা কেন এই বিশৃঙ্খলা-তা খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’
