মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের উদ্বেগ
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ায় জ্বালানির বিশ্ববাজারে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। যদিও দেশে বর্তমানে জ্বালানির মজুত এবং জাহাজে করে আসা সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে, যা মার্চ মাসে কোনো সংকট তৈরি না হওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে, তবুও গত কয়েক দিনে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি তেল বিক্রির পাম্পগুলিতে দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আতঙ্কিত ক্রয় ও কৃত্রিম চাহিদার উদ্ভব
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি নিয়ে যে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকার ফলেই ভোক্তাদের মধ্যে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি কেনার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও শঙ্কা ও আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। সরকার শুরুতেই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নীতি গ্রহণ করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিলেও, জনমনে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় গত কয়েক দিনে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
উদাহরণস্বরূপ, দেশে অকটেনের স্বাভাবিক দৈনিক চাহিদা গড়ে ১,১০০ মেট্রিক টন থাকলেও, বর্তমানে তা ২,০০০ টন ছাড়িয়ে গেছে। ডিজেল ও পেট্রলের চাহিদাও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবস্থা কোনোভাবেই স্বাভাবিক চাহিদা নয়; বরং আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে জ্বালানি কেনা এবং অনেকে বেআইনিভাবে মজুত করার কারণেই এমন কৃত্রিম চাহিদা ও সংকট তৈরি হয়েছে।
সরকারের সঞ্চয়ী নীতি ও রেশনিং ব্যবস্থা
সংকট মোকাবিলায় সরকার জ্বালানি তেল বিক্রির ক্ষেত্রে রেশনিং চালু করেছে এবং গত রোববার থেকে সরবরাহ ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। মার্চ মাসে সংকট না হলেও, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে—এই বিবেচনায় সরকারের এই সঞ্চয়ী নীতি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, জ্বালানি তেল নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে সৃষ্ট শঙ্কা ও উদ্বেগ নিরসনের দায়িত্বও সরকারের উপর বর্তায়। এ ক্ষেত্রে জ্বালানির মজুত ও সরবরাহের প্রকৃত চিত্র নিয়মিতভাবে নাগরিকদের জানানো এবং তাদের আশ্বস্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানের মতে, জ্বালানির মজুতের পাশাপাশি কী পরিমাণে পাইপলাইনে আছে, জাহাজগুলোর অবস্থান এবং কবে দেশে আসবে—এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত ব্রিফিং করা প্রয়োজন। বর্তমান সংকটটি একটি বৈশ্বিক সংকট, যার ওপর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। ভোক্তাদের এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি কেনার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার আহ্বান
দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে নাগরিকদের সাশ্রয়ী ও সংযমী হতে হবে। একই সাথে, সরকারকে জ্বালানি তেলের ডিপো ও পাম্পগুলোর দিকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে করে মজুত, পাচার ও কালোবাজারির সুযোগ কেউ না পায়। মজুতকারী ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা হতে হবে পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল। জ্বালানির সরবরাহ অবশ্যই ন্যায্যতার ভিত্তিতে হতে হবে, এবং সবার আগে জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ নিয়ে সরকারকে জ্বালানি খাতের সংকট ব্যবস্থাপনার কৌশল ঠিক করা উচিত। এই পদক্ষেপগুলোই বাংলাদেশকে বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।



