মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে ঢাকার পেট্রোল পাম্পে তেল সংকট, ভোগান্তিতে নগরবাসী
ঢাকার পেট্রোল পাম্পে তেল সংকট, ভোগান্তিতে নগরবাসী

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে ঢাকার পেট্রোল পাম্পে তেল সংকট, ভোগান্তিতে নগরবাসী

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে বা সংকট দেখা দিতে পারে— এমন আশঙ্কায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে গত কয়েকদিন ধরে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মতো শনিবার এবং রবিবার (৮ মার্চ) ঢাকার বহু পাম্পে তেল না পেয়ে সাধারণ মানুষ মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। পেট্রোল পাম্প মালিকদের অভিযোগ, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় শনিবার ডিপো থেকে পাম্পে তেল সরবরাহ না করায় এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: লাইনে দাঁড়িয়েও তেল মিলেনি

রাজধানীর পান্থপথে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাসুম বিল্লাহ তার বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “গতকাল কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি। তার আগের দিনও একই অবস্থা ছিল। তেল না থাকায় আজকে মোটরসাইকেল বের করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে যানজট ঠেলে বাসে করে অফিসে আসতে হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “সরকার দাবি করছে যে পর্যাপ্ত মজুত আছে, কিন্তু বাস্তবে পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। মিরপুরের সনি স্কয়ার থেকে ধানমন্ডি ২৭ পর্যন্ত সব পেট্রোল পাম্প বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য এলাকায় যেসব পাম্প খোলা আছে, সেখানে মাইলখানেক লম্বা লাইন দেখা গেছে।”

পাম্পে তেল সংকটের চিত্র

মাসুম বিল্লাহর এই অভিযোগ একক নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনেক নাগরিক পাম্প ঘুরেও তেল সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কেউ কেউ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, কিছু পাম্পে তেলের অভাবে সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও গাড়ির দীর্ঘ সারি পাম্পের সীমানা ছাড়িয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা যানজটের সৃষ্টি করছে।

পাম্প সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা জানান, গুজব বা আশঙ্কার কারণে গত তিন দিনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে তেল বিক্রি হয়েছে। ফলে বহু পাম্পের মজুত দ্রুত শেষ হয়ে গেছে, যা এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

পাম্প মালিক সমিতির বক্তব্য

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির (একাংশের) সভাপতি মিজানুর রহমান এই পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আতঙ্কের কারণে অনেকেই তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করেছেন। এতে করে অসংখ্য পাম্পে তেলের মজুত দ্রুত নিঃশেষ হয়ে গেছে। শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সাধারণত তেলবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। এই সময়ে পাম্পে তেল সরবরাহ করা হয় না। যদি এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হতো, তাহলে এই সমস্যা এড়ানো যেত।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের প্রতিদিন চার গাড়ি তেলের প্রয়োজন, কিন্তু মাত্র এক গাড়ি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সময়ের অনেক আগেই পাম্পে তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমরা এই রেশনিংয়ের ভোগান্তি পোহাচ্ছি। তেল সরবরাহ করতে না পারায় গ্রাহকদের কাছ থেকে পিটুনিও খেতে হচ্ছে আমাদের। চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করার পাশাপাশি আমাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”

বিপিসির বক্তব্য: মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক

অন্যদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে যে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। চলতি মাস এবং আগামী মাসের জন্য আমদানিও নিশ্চিত করা হয়েছে বলে তারা দাবি করে। আগামী সোমবার আরও দুটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া, এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে বিপিসি নিশ্চিত করেছে।

বিপিসির এক কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেন যে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত পেট্রোলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের একটি বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। তাই এই দুই ধরনের জ্বালানি তেল নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।