মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক: সরকারি আশ্বাস
জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক, সরকারের আশ্বাস

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক: সরকারি আশ্বাস

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য সংকট ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। চলতি মাস এবং আগামী এপ্রিল মাসের জন্য প্রয়োজনীয় তেল আমদানির প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির বক্তব্য

জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের বন্দরে একটি জাহাজ থেকে তেল খালাস করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে আরও দুটি জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়াও, এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত পেট্রোলের প্রায় পুরোটাই দেশীয় উৎপাদন। অকটেনের একটি বড় অংশও স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়, যা গ্রাহকদের জন্য উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে মনে করা হচ্ছে।

গত কয়েকদিনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেল কেনার চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। শনিবার পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে, যেখানে অনেক এলাকায় দুপুরের পর তেল বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

বিপিসির কর্মকর্তারা এই অবস্থার জন্য আতঙ্কিত গ্রাহকদের অতিরিক্ত তেল কেনা এবং কিছু ব্যবসায়ীদের মুনাফা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মজুত করার প্রবণতাকে দায়ী করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, নাটোরের সিংড়ায় বাঁশঝাড়ের নিচে ১০ হাজার লিটার ডিজেল মজুত রাখার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

আমদানি ও সরবরাহ পরিকল্পনা

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে মোট ১৪টি কার্গো জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে এবং বাকিগুলো পথে রয়েছে। আগামী মাসের জন্য ১৫টি কার্গোর মধ্যে ১৩টির সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে, বাকি দুটি মে মাসে পাঠানো হবে বলে সরবরাহকারীরা নিশ্চিত করেছেন।

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনার বিষয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে না। জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনা জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকায় তেল পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম

দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদা পরিসংখ্যান

দেশে জ্বালানি তেলের উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং অন্যান্য বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। অন্যদিকে, বাংলাদেশে পেট্রোল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন।

সংশ্লিষ্টরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, বাংলাদেশের পেট্রোল মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হয়। কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত পেট্রোলের পরিমাণ অনেক সময় দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি হয়ে যায়। এই পেট্রোলের সাথে আমদানি করা অকটেন বুস্টার মিশিয়ে অকটেন তৈরি করা হয়, ফলে দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের সিংহভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি মজুত

এদিকে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ফার্নেস অয়েলের মজুত প্রায় ৫০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। এটি দেশের শক্তি নিরাপত্তার জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সর্বোপরি, সরকারি সংস্থাগুলো আশা প্রকাশ করছে যে, বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় গত কয়েকদিনে পাম্পগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি জ্বালানি তেল বিক্রি হলেও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।